
নয়াদিল্লি: রবিবার বিকেলে একেবারে আচমকা দুবাইতে নামেন ভিভিআইপি গেস্ট। তিনি দুবাইতে নামলেন, পতাকা ছাড়া লিমুজনে করে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ৫ ঘণ্টা পর অন্য একটা গাড়িতে বিমানবন্দরে এলেন এবং উড়ে গেলেন নিজের গন্তব্যে। ফ্লাইট ট্র্যাকারের মতো সংস্থাও এই উড়ানের গতিবিধি নিয়ে কোনও তথ্য দিতে পারেনি। ওইদিন রাতে ইজরায়েলের সংবাদপত্র হার্তেজের প্রতিবেদনে ঘিরে হুলুস্থুলু কাণ্ড। হার্তেজের ওই প্রতিবেদনে দাবি, রবিবার বিকেলে ৫ ঘণ্টার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE) সফর করেছেন ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
ইউএই-র প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও দুই দেশের গোয়েন্দা প্রধান এবং সেনাকর্তার মধ্যেও বৈঠক হয়েছে। ইউএই- ইজরায়েলের সরকারিভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। টেবিলের তলায় দুই দেশের সম্পর্ক আছে। কিন্তু প্রকাশ্যে কোনও দেশই সেটা স্বীকার করে না। তাই নেতানিয়াহু নিজে দুবাইয়ে পৌঁছে যাওয়ায় দুনিয়ার তাবড় দেশ হকচকিয়ে গিয়েছে। একেবারে নিঃশব্দে ঐতিহাসিক রদবদল। পরিবর্তিত বিশ্বে নতুন পাওয়ার গ্রুপ। সব সমীকরণ উলটে পাল্টে দিয়েই তৈরি হচ্ছে নতুন এক শক্তি-অক্ষ। নিঃশব্দে।
ইজরায়েল- আমিরশাহীর সঙ্গে এই শক্তি অক্ষে সামিল ভারত। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি ভারতে এসেছিলেন ইউএই-র প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহান। মাত্র ৩ ঘণ্টা ভারতে ছিলেন। কূটনীতিক ভাষায় যাকে বলে আউটিং ভিজিট। একটু গল্পগুজব, খাওয়া-দাওয়া, হাত মিলিয়ে ফিরে যাওয়া। আউটিং ভিজিটে এর বেশি কিছু হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউএই-র প্রেসিডেন্টের এই সফর শুধুই আউটিং ভিজিট ছিল না। এর চার মাস পর, এপ্রিলে দুবাইয়ে নামেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ইউরোপ যাওয়ার পথে কয়েক ঘণ্টার সফর। ততদিনে ওপেক থেকে বেরিয়ে গিয়েছে ইউএই।
কূটনীতিকদের একটা অংশ এখন বলছেন, নতুন শক্তি-অক্ষের বিভিন্ন দিক ঝালিয়ে নিতেই এত ঘনঘন মিটিং – সফর হচ্ছিল। পাকিস্তান, সৌদি আরব আর তুরস্ক মক্কা চুক্তি সই করার পর ভারত- ইজরায়েল একই ধাঁচে সামরিক জোটের কথা ভাবছিল। তাতে অসুবিধা ছিল না, কারণ দুই দেশের স্বার্থ এবং চ্যালেঞ্জ মোটামুটি একইরকম। সৌদি আরবের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর সম্পর্ক এখন তলানিতে। সৌদিকে কার্যত থ্রেট বলেই মনে করছে আমিরশাহী প্রশাসন।
কূটনৈতিক মহল সূত্রে খবর, আমিরশাহীই এই জোটে সামিল হতে আগ্রহ দেখায়। ভারতকে সামনে রেখে দফায় দফায় আলোচনা চলে। কূটনৈতিক মহল বলছে, রবিবার ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যে ইউএই-তে চলে গেলেন, এটা এত কিছুর আউটকাম। মজার কথা হল, তিনি যে আমিরশাহী সফরে গিয়েছিলেন, ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সেটা মানতে নারাজ। সেই খবর প্রকাশের জন্য হার্তেজের বিরুদ্ধে মামলারও হুমকি দিয়েছে নেতানিয়াহু প্রশাসন। কিন্তু রবিবার নেতানিয়াহুর কর্মসূচি নিয়ে কোনও তথ্য দিতেও রাজি নয় ইজরায়েলি প্রশাসন।
ইজরায়েলে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পি এন দেওল বলছেন, এই সফরের কথা ইজরায়েল কখনই স্বীকার করবে না। তবে তাতে কিছু আটকাবে না। মক্কা চুক্তির পাল্টা নতুন শক্তিসাম্য তৈরি হয়েই গিয়েছে। এই জোট কী করবে? জানা যাচ্ছে, তিন দেশ মক্কা চুক্তির কোনও অভিন্ন চুক্তি করবে না। প্রকাশ্য কোনও ঘোষণা ছাড়াই কাজ করবে। নতুন জোটের লক্ষ্য বলতে তিনটে। এক, সিকিউরিটি গ্যারান্টি। দুই, জ্বালানি সহযোগিতা। তিনে, ন্যাটোর ধাঁচে অভিন্ন নীতি করা। ভারত- ইউএই- ইজরায়েল। কেউ কারও প্রতিবেশী নয়। ইউএই-র সঙ্গে তো দীর্ঘদিন ইজরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কই ছিল না। আবার ভারতের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কই অত্যন্ত ভালো।
তিনটে দেশ হঠাত্ করে ন্যাটোর ধাঁচে জোটের কথা ভাবতে গেল কেন?
বেশ কয়েকটা কারণ আছে। প্রথমত, ইরাক- আমেরিকা সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতের কথা ভেবে অস্ত্র এবং জ্বালানির সাপ্লাই লাইন খুলে রাখা। তৃতীয়ত, পরিবর্তিত বিশ্বে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত তিন মাস ধরে ইউএই-কে হ্যারোপ এবং হ্যারন ড্রোন দিচ্ছে ইজরায়েল। ইজরায়েল আর ইউএই-র মধ্যে কোনও প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল না। তা সত্ত্বেও ইরানের হামলা ঠেকানোর জন্য ড্রোন পাঠাচ্ছে ইজরায়েল।
কূটনীতিকদের একটা অংশের দাবি, পাকিস্তান- সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তির পাল্টা আত্মপ্রকাশ করছে নতুন এই জোট। অনেকে আবার বলছেন, নতুন জোটের লক্ষ্য অনেক সুদূরপ্রসারী। প্রতিরক্ষা থেকে জ্বালানি হয়ে সড়ক যোগাযোগ – অনেক ইস্যু এর সঙ্গে জড়িয়ে। এই জোট তৈরির পিছনে তিনটে দেশেরই নিজস্ব স্বার্থ আছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইউএই-র মতো বন্ধু থাকলে ইজরায়েলের বিরাট সুবিধা। সুবিধা ভারতেরও। তাই, তলায় তলায় এত প্রস্তুতি।