
নয়া দিল্লি: ট্রেন যাত্রীদের ‘সেকেন্ড ক্লাস প্যাসেঞ্জার’ বলায় আপত্তি সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court)। ভারতীয় রেলওয়ে(Indian Railways)-কে এই শব্দবন্ধের ব্যবহার পুনর্বিবেচনা করতে বলল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের বক্তব্য, ‘ক্লাস’ বা শ্রেণির উল্লেখ যাত্রীর নয়, কোচের ক্ষেত্রে হওয়া উচিত। কারণ, কোনও যাত্রীকে ‘সেকেন্ড ক্লাস প্যাসেঞ্জার’ বলে উল্লেখ করা ভারতের সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী এবং তা গ্রহণযোগ্য নয়।
ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত এক যাত্রীকে সরকারি নথিতে ‘সেকেন্ড ক্লাস প্যাসেঞ্জার’ (Second Class Passenger) বলে উল্লেখ করায় শুক্রবার আপত্তি জানায় সুপ্রিম কোর্ট। এই ধরনের শব্দপ্রয়োগ দেশের সামাজিক শ্রেণিবিভাগের ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয় বলেই উল্লেখ করে শীর্ষ আদালত। এটি ভারতের সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী। তাই সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষকে তাদের ম্যানুয়াল ও সরকারি নথিতে ‘সেকেন্ড ক্লাস প্যাসেঞ্জার’ (Second Class Passenger) শব্দবন্ধের ব্যবহার পুনর্বিবেচনা করার নির্দেশ দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি এন. কোটিস্বর সিংয়ের বেঞ্চ ১৯ পাতার রায়ে জানিয়েছে, ‘সেকেন্ড ক্লাস’ শব্দটি যাত্রীর সঙ্গে নয়, বরং কোচের শ্রেণি বোঝাতে ব্যবহার করা উচিত। কারণ কোনও যাত্রীকে ‘সেকেন্ড ক্লাস’ বলা সংবিধানের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট আরও বলে, “যাত্রীদের নিরাপত্তার দায় শুধু রেলের নয়, যাত্রীদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। চলন্ত ট্রেনে ওঠা-নামা বা ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াতের প্রবণতা এখনও অনেকের মধ্যে রয়েছে”। বাস্তব জীবনের নানা প্রয়োজন থাকলেও, জীবন রক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করে শীর্ষ আদালত।
২০১৫ সালে চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে মৃত্যু হয় চন্দ্রকান্ত ঠাক্কর নামক এক ব্যক্তির। পরিবার রেলের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করে, কিন্তু ওই যাত্রীর টিকিট দেখাতে পারেনি। তাঁর স্ত্রীর দাবি ছিল, তিনি (চন্দ্রকান্ত) বৈধ টিকিট কেটেই ট্রেনে উঠেছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর তাঁর ব্যাগ খুঁজে পাওয়া যায়নি, ফলে টিকিটও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
রেলওয়ে ক্লেমস ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিপূরণের আবেদন খারিজ করে দেয়। পরে মধ্য প্রদেশ হাইকোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এরপর মৃতের স্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। তিনি ৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং ১৮ শতাংশ সুদ দাবি করেন।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তির কাছে টিকিট না পাওয়া মানেই তিনি অবৈধ বা বিনা টিকিটের যাত্রী ছিলেন—এমন বলা যায় না। শীর্ষ আদালত বলে, “মৃত ব্যক্তি ট্রেনে যাত্রা করছিলেন এবং দুর্ঘটনাও ট্রেনেই ঘটেছে, তা নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। তাই শুধু টিকিট উদ্ধার না হওয়ার কারণে তাঁকে প্রকৃত যাত্রী হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া ভুল।”
এর পাশাপাশি, রিনা দেবী বনাম ভারত সরকার এবং ডোলি রানি সাহা বনাম ভারত সরকার মামলার আগের রায়ের উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, মৃত ব্যক্তির কাছে টিকিট না মিললেও তাঁর বৈধ যাত্রী (bona fide passenger) হিসেবে মর্যাদা নষ্ট হয় না।
এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট রেলওয়ে ক্লেমস ট্রাইব্যুনাল এবং মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের রায়ে ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেছে এবং ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে যথাযথ নয় বলে জানায়। একইসঙ্গে নিহতের স্ত্রীকে ৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট।