
লখনউ: চমকে দিল উত্তর প্রদেশ। ২০০৯ সালে উত্তর প্রদেশের ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে মাত্র ১০টি পেয়েছিল বিজেপি। তারপর থেকে মোদী সুনামিতে ভর করে উল্কার গতিতে এই রাজ্যে বেড়েছে বিজেপির শক্তি। ২০১৪ সালে ৭১টি আসনে জয় পেয়েছিল গেরুয়া শিবির, ২০১৯-এ ৬২। ২০২৪-এ সংখ্যাটা আরও বাড়বে বলে আশা করেছিল বিজেপি। রাম মন্দিরের হাওয়ায় ৮০তে ৮০ পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল তারা। কিন্তু, কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী ঝড়ের সামনে থমকে গিয়েছে মোদী-যোগী ডবল ইঞ্জিনের শক্তি। ২৩টি আসনে জয়ী সপা, এগিয়ে আরও ১৪টিতে। সব মিলিয়ে ৩৭টি আসন জিততে পারে। কংগ্রেসও জয় ও এগিয়ে থাকা মিলিয়ে জিততে পারে ৬টি আসন। উল্টোদিকে, বিজেপি জিতে গিয়েছে ২২টি আসনে, এগিয়ে আরও ১১টি আসনে। সব মিলিয়ে ৩৩। হঠাৎ হল কী? ২০০৯-র পর থেকে বিজেপির লেখচিত্রটা ক্রমেই উপরে উঠছিল। এবার কোথায় ভুল হল মোদী-যোগী জুটির?
এই ফলের পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কী কী কারণ?
প্রথমত, উত্তর প্রদেশে ‘পিডিএ’-র উপর জোর দিয়েছিলেন অখিলেশ যাদব। পিডিএ মানে পিছড়ে (অনগ্রসর শ্রেণি), দলিত এবং অল্পসংখ্যক (সংখ্যালঘু)। এই তিন শ্রেণির ভোটই পেয়েছে সপা এবং কংগ্রেস।
এর পিছনে অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে বিজেপির ‘৪০০ পারে’র স্লোগানের। বস্তুত, এই স্লোগান বিজেপির ক্ষতিই করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ৪০০ পারের স্লোগান দেওয়ার পরই অনন্ত হেগড়ে-সহ বহু বিজেপি নেতাই দাবি করেন, ৪০০ পার হলে সংবিধান বদলানো হবে। সেই সূত্র ধরেই বিরোধী পক্ষ প্রচার চালায়, এনডিএ ৪০০-র বেশি আসন পেলে সংবিধান সংশোধন করে সংরক্ষণ বাতিল করতে পারে। এই প্রচার সম্ভবত অনগ্রসর শ্রেণি, দলিত এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে বড় প্রভাব ফেলেছে।
বুথ ফেরত সমীক্ষাগুলিতে বলা হয়েছিল, রাজ্যের ৮০টি আসনের মধ্যে ৬০টির বেশি আসন জিততে পারে এনডিএ। বিজেপির লক্ষ্য ছিল ৮০। রাম মন্দির স্থাপনের প্রতিশ্রুতি পূরণের ফলে উত্তর প্রদেশের মানুষ তাদের নির্বাচন দুহাতে আশীর্বাদ করবে বলে মনে করেছিল বিজেপি। কিন্তু, কার্যক্ষেত্রে রামকে মানুষ ধর্মবিশ্বাসের জায়গাতেই রেখেছেন, রাজনীতিতে টেনে নামাতে চাননি। এমনকি, রাম মন্দির যে ফৈজাবাদ আসনের অন্তর্গত, সেই ফৈজাবাদেও হেরেছেন বিজেপি প্রার্থী।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী তিহার জেল থেকে বেরিয়েই একটা বিস্ফোরক দাবি করেছিলেন। বলেছিলেন, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে শিগগিরই য়োগী আদিত্যনাথকে সরিয়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বিজেপি অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছিল, এই ধরনের কোনও পদক্ষেপ করা হবে না। কিন্তু, তারপরও সম্ভবত রাজ্যের বেশ কিছু অংশে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, কেন্দ্র অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠছে। কাজেই, এই ধরনের পদক্ষেপ করতেই পারেন মোদী। উত্তর প্রদেশে কিন্তু, মোদী-ভক্তর পাশাপাশি যোগী ভক্তেরও সংখ্যা কম নয়।
জিডিপি বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে, বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতি ভারত। কিন্তু বাস্তবে মানুষ দেখেছেন, গ্যাস সিলিন্ডার, জ্বালানির মতো নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ক্রমে বেড়ে চলেছে। এই মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচার করেছে বিরোধীরা। যাও সম্ভবত রাজ্যে বিজেপির বিরাট জয়ের সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে।
এছাড়া, এবারের নির্বাচনে বিরোধীরা অস্ত্র করেছিল কর্মসংস্থানের অভাবকে। ১০ বছরে যুবদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। মোদী সরকার স্টার্টআপ থেকে শুরু করে পকোড়া ভাজাকে কাজ বলে দাবি করে। কিন্তু, সাধারণ মানুষের কাছে সম্ভবত, বিরোধীদের ৩০ লক্ষ সরকারি চাকরির শূণ্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি সম্ভবত অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
মোদীর একনিষ্ঠ ভোটারদের মধ্যে একটা বড় অংশ ছিলেন মহিলারা। কিন্তু এবারের ভোটের আগে দরিদ্র মহিলাদের কংগ্রেস প্রতি মাসে ৮,৫০০ টাকা এবং প্রতি বছরে ১ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। রাহুল গান্ধী, উত্তর প্রদেশে তাঁর সমস্ত জনসভায় এই প্রতিশ্রুতির উল্লেখ করেছেন। এটাও সম্ভবত উত্তর প্রদেশে বিজেপির খারাপ ফলের অন্যতম কারণ হয়েছে।