
নয়াদিল্লি: প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিজেপির প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদবাণীর আজ জন্মদিন। ৯৯ বছর পূর্ণ করে শততম বছরে পা দিলেন তিনি। এই বিশেষ দিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। শুধু শুভেচ্ছা জানানোই নয়, একটি বিশেষ নিবন্ধ লিখে আডবাণীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায় এবং দেশের প্রতি তাঁর অবদানের কথাও স্মরণ করলেন প্রধানমন্ত্রী। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘আজ ৮ নভেম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। শ্রদ্ধেয় এলকে আদবাণীজি তাঁর জীবনের শততম বছরে প্রবেশ করছেন। এই বিশেষ দিনে তাঁকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। ভারতবর্ষের প্রতি তাঁর অমূল্য অবদানের কথা তুলে ধরে আমি একটি নিবন্ধ লিখেছি।’
আডবাণীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নিবন্ধ-
নিজের নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘আজ ৮ নভেম্বর লালকৃষ্ণ আদবাণী তাঁর জীবনের শততম বছরে প্রবেশ করছেন। কাকতালীয়ভাবে, এ বছর তাঁর জন্মদিন দীপাবলির সঙ্গে মিলে গিয়েছে। এই উৎসব ভগবান রাম এবং আলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এমন এক সময়ে এই বিশেষ দিনটি এসেছে, যখন আমরা জনসংঘের প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী পালন করছি। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ১০০ বছর পূর্তিও উদযাপন করেছি।’
আদবাণীর জন্মদিনে আবেগপ্রবণ মোদী-
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, আদবাণীর জন্মদিন তাঁর কাছে ব্যক্তিগতভাবেও অত্যন্ত আবেগের একটি মুহূর্ত। মোদীর কথায়, ‘আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি যে সবসময় আদবাণীজির স্নেহ, সান্নিধ্য ও পরামর্শ পেয়েছি। তাঁর সঙ্গে কাটানো অসংখ্য মুহূর্ত এবং তাঁকে ঘিরে নানা স্মৃতি আজ মনে ভিড় করছে।’ মোদীর মতে, আধুনিক ভারতের এতগুলি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা খুবই কম। ১৯২৭ সালের ৮ নভেম্বর দেব দীপাবলির দিন জন্ম হয়েছিল আদবাণীর। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তরুণ বয়সেই সিন্ধে নিজের পরিচিত জগৎ ছেড়ে আসার যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু কোনও তিক্ততা মনে না রেখে শূন্য থেকে নতুন করে জীবন গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শূন্য থেকে শুরু করার এই ক্ষমতা আদবাণীর মধ্যে বরাবরই ছিল। জনসংঘকে শক্তিশালী করা থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে বিজেপি গড়ে তোলা, সব ক্ষেত্রেই তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। বিজেপির সভাপতি থাকাকালীন ১৯৮৯ সালে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা ৪০০ থেকে কমে ২০০-র নীচে নেমে আসে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিজেপি। একাধিক প্রজন্মের দলীয় কর্মীকে তৈরি করেছিলেন আদবাণী। ‘নেশন ফার্স্ট’ বা ‘সবার উপরে রাষ্ট্র’ নীতির ভিত্তিতে দলের ভিত মজবুত করেছিলেন তিনি।
আদবাণীর দুটি বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ-
আদবাণীর মধ্যে থাকা দুটি বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করেছেন মোদী। প্রথমটি হল তাঁর আদর্শগত স্বচ্ছতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক তীক্ষ্ণতা। তাঁর বক্তৃতা ও লেখায় এই গুণের প্রতিফলন দেখা যেত। জনসংঘ এবং বিজেপির জন্য তৈরি করা তাঁর প্রস্তাবগুলি আজও পড়ার মতো। একইভাবে তাঁর সাক্ষাৎকারগুলিও ছিল অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও প্রভাবশালী। দ্বিতীয় গুণটি হল, ভারতীয় রাজনীতির একটি বড় অংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবণতা চিহ্নিত ও প্রকাশ্যে আনার ক্ষমতা।
প্রতিটি দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন-
প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, আদবাণী প্রতিটি দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের সঙ্গে পালন করেছেন। আরএসএস প্রচারক হিসেবে প্রথমে রাজস্থানের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করেছিলেন তিনি। পরে দিল্লিতে এসে অটলবিহারী বাজপেয়ির সঙ্গে কাজ শুরু করেন। মোদীর কথায়, কয়েক দশক ধরে দুই বড় রাজনৈতিক নেতার একসঙ্গে কাজ করা এবং কোনও প্রতিযোগিতা ছাড়াই একে অপরকে সহযোগিতা করার ঘটনা বিরল। আদবাণী ও বাজপেয়ি এই ক্ষেত্রে এক অনন্য নজির তৈরি করেছিলেন। দু’জনে মিলে ভারতীয় রাজনীতির গতিপথই বদলে দিয়েছিলেন।
সংসদীয় রাজনীতিতে আদবাণীর যাত্রা-
১৯৭০ সালে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন আদবাণী। সংসদে তাঁর বক্তব্য এবং বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ সব রাজনৈতিক দলের কাছেই প্রশংসিত হয়েছিল। সাংসদ হিসেবে, পরবর্তীকালে সংসদের দুই কক্ষে বিরোধী দলনেতা এবং শাসকপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন তিনি। সংসদীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিয়মিত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনের স্মৃতিচারণ-
১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনের স্মৃতিও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। ঠিক হয়েছিল, আদবাণীজি দুটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তার মধ্যে একটি ছিল গান্ধীনগর। গুজরাটের সঙ্গে তাঁর পুরনো সম্পর্ক ছিল। দেশভাগের পর তাঁর বাবা কচ্ছ এলাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন। আদবাণীজি গুজরাট থেকে রাজ্যসভার সাংসদও ছিলেন। তাই গান্ধীনগর থেকে ভোটে লড়া অনেকটা ঘরে ফেরার মতো ছিল।’
মোদী আরও জানিয়েছেন, বিজেপির সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে আদবাণীর মনোনয়নপত্র তৈরি করা থেকে শুরু করে গোটা নির্বাচনী প্রচারে তাঁকে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। গান্ধীনগরের মানুষ বারবার তাঁকে সংসদে পাঠিয়েছেন। গান্ধীনগরের একজন ভোটার হিসেবে নিজেও একাধিকবার আদবাণীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন মোদী। নিজের লোকসভা কেন্দ্রের প্রতি আদবাণীর যত্ন ও দায়িত্ববোধ থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ-
আদবাণীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা। মোদীর কথায়, গণতন্ত্র রক্ষা এবং সংবিধানকে সুরক্ষিত রাখার লড়াইয়ে সামনের সারিতে ছিলেন আদবাণী। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখা ‘আ প্রিজনার্স স্ক্র্যাপ-বুক’ বইয়ে উঠে এসেছে। বইটির ‘আ টেল অফ টু ইমার্জেন্সিজ’ শীর্ষক একটি অংশে ১৯৭৫ সালের জুন মাস থেকে ভারতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির সঙ্গে ১৯৩৩ সালের নাৎসি জার্মানির ঘটনাগুলির চমকপ্রদ সাদৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও আদবাণীর প্রশংসা-
শুধু দক্ষ বিরোধী নেতাই নন, একজন সফল প্রশাসক হিসেবেও আদবাণীর প্রশংসা করেছেন মোদী। ১৯৭৭ সালে জনতা সরকার ক্ষমতায় আসার পর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। ওই মন্ত্রকের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর কাজ অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
উপপ্রধানমন্ত্রী এবং দেশের দীর্ঘতম সময় ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারীদের অন্যতম হিসেবে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন আদবাণী। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জীবনযাত্রার উন্নতিতেও তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থানের ফলেই দেশে একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসবিরোধী আইন কার্যকর করা সম্ভব হয়েছিল বলেও লিখেছেন মোদি।
সোমনাথ থেকে অযোধ্যা রথযাত্রার স্মৃতিচারণ-
আদবাণীর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল সোমনাথ থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত রথযাত্রা। প্রধানমন্ত্রীর মতে, এই যাত্রা ভারতীয় সমাজের গতিপথ ইতিবাচকভাবে বদলে দিয়েছিল। মোদী লিখেছেন, ‘এই যাত্রার ভাবনা তৈরি হওয়া থেকে শুরু করে তার বাস্তবায়ন পর্যন্ত যুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। যাত্রা শুরুর সময় সোমনাথে উপস্থিত থাকা আমার কাছে বিশেষ স্মরণীয়। একটি রথযাত্রা অত্যন্ত কঠিন। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা, একটানা ভ্রমণ, শারীরিক সহনশীলতা এবং ক্লান্তির মধ্যেও লক্ষ্যে অবিচল থাকা প্রয়োজন। আডবাণীজি এই সহনশীলতার এক অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করেছিলেন।’
বিহারে আদবাণীর গ্রেফতারির ঘটনাও স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর পর গুজরাটে চিমনভাই প্যাটেলের সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল বিজেপি। মোদীর বক্তব্য, এর মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, দলের আদর্শ এবং রামমন্দিরের প্রশ্নে কোনও আপস করা হবে না।
সেই সময় দলের বহু প্রবীণ নেতা ও কর্মী শপথ নিয়েছিলেন, যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন, রামমন্দির তৈরি হবেই। বহু বছর পর দেশের মানুষের আশীর্বাদে অযোধ্যায় ভগবান রামের বিশাল মন্দির বাস্তবায়িত হয়েছে বলেও লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী।
সাধারণ কর্মীর মতো জীবন কাটিয়েছেন আদবাণী-
আদবাণীর ব্যক্তিত্বের আরও কয়েকটি দিক তুলে ধরেছেন মোদী। তাঁর কথায়, আদবাণীর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর সাধারণ জীবনযাপন। নবনির্মাণ আন্দোলনের পর জুনাগড়ে গিয়ে প্রায় এক মাস সাধারণ দলীয় কর্মীর মতো থেকেছিলেন তিনি। বিধানসভা নির্বাচনের জন্য দলকে প্রস্তুত করেছিলেন। সেই নির্বাচনে কংগ্রেসকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ভোটাররা।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, আদবাণী বরাবরই দেখিয়েছেন, জনজীবনে সততা ও স্বচ্ছতার অর্থ কী। পড়াশোনার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁরা জানেন কতটা মনোযোগ দিয়ে তিনি সংবাদপত্র পড়তেন। সিনেমা ও থিয়েটারের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। একজন উৎসাহী চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান এবং ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁর লেখা ‘মাই কান্ট্রি, মাই লাইফ’ বইয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
সিন্ধি সংস্কৃতির সঙ্গেও বরাবর যুক্ত ছিলেন আদবাণী। লেহের কাছে ‘সিন্ধু দর্শন পূজা’ জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও উদ্যোগী হয়েছিলেন তিনি। মোদী জানিয়েছেন, আদবাণী এবং জর্জ ফার্নান্ডেজের সঙ্গে তিনিও এমন একটি পুজোয় অংশ নিয়েছিলেন।
কমলা আদবাণীকেও স্মরণ মোদীর-
আদবাণীর দীর্ঘ ও অসাধারণ জীবনের কথা বলতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী কমলা আদবাণীর কথাও স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, কমলা আদবাণীর উল্লেখ ছাড়া এই দীর্ঘ যাত্রার কোনও বিবরণই সম্পূর্ণ হতে পারে না। আদবাণীর জনজীবনে তিনি সবসময় শক্তি ও ভরসার উৎস ছিলেন।
করাচিতে বেড়ে ওঠা আদবাণী হয়তো কখনও ভাবেননি তাঁর জীবন কোন পথে এগোবে। কিন্তু ভারতীয়রা তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে ২০২৪ সালে তাঁকে ‘ভারতরত্ন’ সম্মানে ভূষিত করেছেন। জীবনের শততম বছরে পা রাখা আদবাণীর সুস্বাস্থ্য কামনা করে মোদী লিখেছেন, ‘আমি প্রার্থনা করি, তিনি সুস্থ থাকুন এবং বরাবরের মতো আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে যান।’