
নয়া দিল্লি: রাজধানীতে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁঝ যখন বাড়ছে। পথে নেমেছেন বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীরা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন চলছে। এই আবহে দেশবাসীকে খোলা চিঠি লিখলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা।
খোলা চিঠিতে তাঁরা লিখেছেন, “আমরা প্রাক্তন বিচারপতি এবং অবসরপ্রাপ্ত পদাধিকারী হিসেবে এই চিঠি লিখছি। আমরা কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করি না। আমরা এই চিঠি লিখছি কারণ, এই মুহূর্তে নীরব থাকা আর কোনও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত হতে পারে না।”
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা বলছেন, “ভারতের সাংবিধানিক সংস্থাগুলো ক্রমাগত আক্রমণের মুখে পড়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) এই আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এমনকী বিচার ব্যবস্থা, যাকে আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখি, সেটাও রেহাই পায়নি।”
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মতে, আদতে এই আক্রমণ ভারত তথা বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রকে অস্থির করার চেষ্টা। পরিণতি বিবেচনা না করেই রাজনৈতিক উদ্দেশে এই পরিকল্পিত করা হয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রতিষ্ঠানগুলির সমালোচনা করা একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেগুলোকে অবমাননা করা নয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে জনসমক্ষে “চোর”, “পুতুল” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে বলেও সমালোচনা করা হয়েছে ওই চিঠিতে। তাঁরা লিখেছেন, “যাঁরা নির্বাচন পরিচালনা করেন, সেই আধিকারিকদের নাম প্রকাশ করে লজ্জিত করা হচ্ছে এবং ক্ষমতা পরিবর্তন হলে প্রকাশ্যে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কোনও আদালতই এই ধরনের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়নি।”
ভোট চুরির অভিযোগকে আদালতের সামনে না এনে প্রেস কনফারেন্সে কেন আনা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে। চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কমিশন যখন শপথনামা চেয়ে পাঠায়, তখন কেউই তা জমা দেয় না। কেবল হারের পর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনকে (EVM) দোষারোপ করা হয়। অথচ একই মেশিনে অন্যান্য় জয়ের বিষয়ে কেন কোনও প্রশ্ন তোলা হয় না?
আইনি মামলার দীর্ঘ রেকর্ড থাকা কিছু অ্যাক্টিভিস্ট গোষ্ঠী এই দাবিগুলোকে আইনি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও দাবি করেছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা। বিচার ব্যবস্থার ওপর জনসাধারণের আস্থা নষ্ট করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই বিদ্বেষমূলক বার্তাগুলোকে বড় আকারে প্রচার ও বিস্তার করা হচ্ছে।
নির্বাচনী ব্যবস্থার অংশ বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) সেই ব্যবস্থারই অংশ। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ধারা ২১(৩) কমিশনকে যে কোনও সময় তালিকা সংশোধন করার ক্ষমতা দেয় বলে উল্লেখ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা। বহুবার এই নিবিড় সংশোধন করা হয়েছে। শেষ নিবিড় সংশোধন করা হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে। তখন কেউ এই সংশোধনকে ষড়যন্ত্র বলেনি। দেশের শীর্ষ আদালতও এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। তাঁরা বলছেন, “নিয়মাবলী একই রয়েছে। এই নিয়মগুলো ২০২৫ সালে লেখা হয়নি। লেখা হয়েছিল ১৯৫০ সালে। SIR নিয়ে এই হইচই একইসঙ্গে আকস্মিক এবং সন্দেহজনকভাবে সুবিধাজনক মনে হচ্ছে।”
গণতন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখার দায়িত্ব নেওয়ার বার্তা দিয়ে তাঁরা উল্লেখ করেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছতার মাধ্যমে আস্থা অর্জন করে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রমাণ ও সঠিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের অভিযোগ পেশ করে, এবং সংবাদমাধ্যম সাধারণ মানুষকে অনুমানের জায়গায় সত্য তথ্য চিনতে সাহায্য করে। তাই সবকিছু বিশ্বাস করার আগে তা যাচাই করার আর্জি জানানো হয়েছে খোলা চিঠিতে।
নির্বাচনকে অবৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না। আপনাদের কোনও অভিযোগ থাকলে উপযুক্ত প্রমাণ সহ কমিশন ও আদালতের কাছে যান।
তথ্য যাচাই ও পর্যালোচনা না করে কোনও অনুমান বা জল্পনা-কল্পনাকে বড় করে সংবাদমাধ্যমে প্রচার করবেন না। একটি শিরোনামই প্রমাণ নয়। বারবার বললেই কোনও অভিযোগ সত্যি হয়ে যায় না।
সাংবিধানিক সংস্থাগুলোকে বলা হয়েছে, দৃঢ় থাকুন, স্বচ্ছতা বজায় রাখুন, উদ্বেগগুলোর সমাধান দিন। রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে থাকুন।
কোনও পদক্ষেপ করার আগে তথ্য যাচাই করে নিন। আপনার ভোট অর্থহীন, কাউকে তা বিশ্বাস করতে দেবেন না। আপনার ভোটই আপনার কণ্ঠস্বর, এবং এর গুরুত্ব অপরিসীম।