
নয়া দিল্লি: ভারতের সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে বড় পদক্ষেপ করল কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার ‘সেমিকন ২.০’ ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন পোর্টাল চালু করলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। পাশাপাশি, ইলেকট্রনিক্স কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং স্কিমের (ECMS) আওতায় আরও ১২টি সংস্থার আবেদন অনুমোদন করেছে কেন্দ্র। এই প্রকল্পগুলিতে মোট ৭,৫০৩ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে সরাসরি ৭,১২৭ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের পরিকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে একাধিক কৌশলগত পদক্ষেপ করছে কেন্দ্র। সেই উদ্যোগেরই পরবর্তী ধাপ সেমিকন ২.0। এই কর্মসূচির জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা মোট ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। ভারতের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতার উপযুক্ত করে তোলাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
সেমিকন ২.০ কর্মসূচিতে মোট ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সেগুলি হল-
১. চিপের নকশা বা ডিজাইন
২. যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় উপকরণ তৈরি
৩. আরও বেশি সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন ইউনিট
৪. ATMP/OSAT শিল্পের আরও সম্প্রসারণ
৫. গবেষণা ও উন্নয়ন
৬. দক্ষ কর্মী ও প্রতিভা তৈরি
শুক্রবার চালু হওয়া ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন পোর্টালের মাধ্যমে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্তম্ভের আওতায় আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। অর্থাৎ, যন্ত্রপাতি ও উপকরণ তৈরি, নতুন সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন ইউনিট স্থাপন এবং সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং সংক্রান্ত শিল্পের সম্প্রসারণে এবার আবেদন করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি।
ইলেকট্রনিক্স কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং স্কিমের আওতায় নতুন করে ১২টি সংস্থার আবেদন অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক। এই প্রকল্পগুলিতে ৭,৫০৩ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে ৩৯,০৪৫ কোটি টাকার উৎপাদন সম্ভব হবে বলে অনুমান। পাশাপাশি, সরাসরি ৭,১২৭টি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
এই ১২টি প্রকল্প দেশের সাতটি রাজ্যে ছড়িয়ে রয়েছে। রাজ্যগুলি হল গুজরাট, কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং উত্তরপ্রদেশ।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে মাল্টি-লেয়ার পিসিবি, রিলে, হিট সিঙ্ক, স্পেশালিটি সিরামিকের মতো ইলেকট্রনিক্স উপাদান। পাশাপাশি, কপার ফয়েল, অ্যানোড মেটেরিয়াল, ক্যাথোড অ্যাক্টিভ মেটেরিয়াল, পলিপ্রোপিলিন ফিল্ম তৈরির প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়াও, কারখানার স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা, নির্ভুল ছাঁচ ও যন্ত্রাংশ এবং বিদ্যুৎ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ECMS-এর আওতায় প্রথমবারের মতো কপার ফয়েল, ক্যাথোড অ্যাক্টিভ মেটেরিয়াল এবং স্পেশালিটি সিরামিক তৈরির প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
এর আগে ECMS-এর আওতায় ৬৯,৫৪৮ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব-সহ ১০৬টি আবেদন অনুমোদনের কথা ঘোষণা করেছিল কেন্দ্র। নতুন ১২টি আবেদন অনুমোদনের পর এই প্রকল্পে মোট অনুমোদিত আবেদনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১১৮। মোট ১৬টি রাজ্যে ৩৪ ধরনের পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের প্রস্তাব ৭৭,০৫১ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে ৫ লক্ষ ৭৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার উৎপাদন এবং ৮১,৭৫৫টি সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে অনুমান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেন, “ভারতের ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্প এখন শুধু পণ্য সংযোজনের পর্যায়ে আটকে নেই। বরং দেশেই বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, উপাদান, মডিউল এবং উন্নত প্রযুক্তির সম্পূর্ণ উৎপাদন গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে ভারত। তিনি জানান, ব্যাটারি সেল, কপার ফয়েল, কপার-ক্ল্যাড ল্যামিনেট এবং উন্নত মানের প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড তৈরিতে দেশের সক্ষমতা বাড়ছে। সরকারি উদ্যোগে দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে।
সেমিকন ২.০-তে যন্ত্রপাতি, উপকরণ, রাসায়নিক এবং গ্যাস উৎপাদনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। ভারতে অন্তত তিনটি বড় যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক সংস্থা এবং পাঁচটি রাসায়নিক ও গ্যাস উৎপাদনকারী সংস্থাকে নিয়ে আসার লক্ষ্য রয়েছে কেন্দ্রের।
কেন্দ্রের দাবি, সেমিকন ইন্ডিয়া কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ছ’টি রাজ্যে মোট ১২টি সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এই প্রকল্পগুলিতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১ লক্ষ ৬৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এর মধ্যে পাঁচটি প্রকল্পে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে।
এছাড়া, ১০৫টি স্টার্টআপকে ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (EDA) টুল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ২৪টি স্টার্টআপকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং ১৫টি স্টার্টআপ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ পেয়েছে।
কেন্দ্রের লক্ষ্য, দেশেই সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের সম্পূর্ণ পরিকাঠামো গড়ে তোলা, আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের অবস্থান আরও মজবুত করা।