
নয়াদিল্লি: একদিন একটি ছোট ছেলে তার দাদুকে জিজ্ঞাসা করল, “দাদু, নিজের দেশের সেবা করতে হলে আমাকে কী করতে হবে?” দাদু মুচকি হেসে তাকে এক গ্লাস জল এনে দিতে বললেন। ছেলেটি তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে এক গ্লাস জল নিয়ে ফিরে এল। দাদু জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন বলো তো, তুমি এইমাত্র কী করলে?” ছেলেটি বলল, “তোমাকে জল এনে দিলাম।” দাদু বললেন, “কেন?” ছেলেটি বলল, “কারণ তোমার তেষ্টা পেয়েছিল।” দাদু বললেন, “তাহলে তুমি কি ভালো কিছু করেছ?” ছেলেটি মাথা নাড়ল। দাদু বললেন, “তাহলে তুমি ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছ।”
ছেলেটি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে বলল, “কিন্তু দাদু, আমি তো দেশের সেবা করার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তোমার সেবা করার কথা তো বলিনি!” বৃদ্ধ আবারও মুচকি হেসে প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা বলো তো, একটি দেশের মধ্যে কারা বসবাস করে?”
সম্ভবত দেশপ্রেম সম্পর্কে আমাদের ধারণার শুরুটা হওয়া উচিত ঠিক এখান থেকেই। কোনও বড় বক্তৃতা, জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান কিংবা কঠিন সংজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং তৃষ্ণার্ত কাউকে এক গ্লাস জল এগিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। কারণ, মানচিত্রে একটি নাম হয়ে ওঠার আগেই দেশ হল লক্ষ লক্ষ মানুষের বাসস্থান। আর দেশকে ভালোবাসতে শেখার আগে, হয়তো সেই দেশের মানুষের প্রতি যত্নশীল হতে শেখা প্রয়োজন।
সাধারণ কাজের মধ্যেও কি দেশপ্রেম থাকতে পারে?
দেশপ্রেম শব্দটিকে আমরা এতটাই বড় করে তুলেছি যে, একজন সাধারণ মানুষ হয়তো ভাবতেই পারেন, তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। আমরা ভাবি সীমান্ত পাহারা দেওয়া সেনাদের কথা, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়া মানুষদের কথা, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা আধিকারিকদের কথা কিংবা দেশের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া নেতাদের কথা। তাঁদের অবদান অবশ্যই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার যোগ্য।
কিন্তু এই ছবির কোথাও আমরা ভুলে গিয়েছি সাধারণ নারী ও পুরুষদের কথা। যে মানুষটি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে যান, ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরেন এবং পরের দিন আবার একই রুটিনে ফিরে যান, তাঁর কথাও কি আমরা ভাবি? অথচ, তিনি হয়তো অজান্তেই দেশের সেবা করে চলেছেন।
ধরুন, সন্ধ্যায় আমরা বাজার থেকে সবজি কিনে আনছি। বাজারে গিয়ে পছন্দমতো সবজি কিনলাম, দাম মিটিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। আমাদের কাছে এটি দিনের আর পাঁচটা সাধারণ কাজের মতোই। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি, সেই সবজি কোথা থেকে এসেছে?
কোনও এক কৃষক পরিবার হয়তো ভোর চারটের সময় ঘুম থেকে উঠেছে। সূর্য ওঠার আগেই কেউ খাবার তৈরি করেছেন। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমোচ্ছেন, তখন কেউ মাঠে গিয়ে পৌঁছেছেন। কেউ গাছে জল দিয়েছেন, আগাছা পরিষ্কার করেছেন, আবহাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করেছেন এবং ফসল ফলার অপেক্ষা করেছেন।
তারপর কেউ সেই ফসল তুলেছেন, কেউ গাড়িতে তুলেছেন, কেউ রাতভর গাড়ি চালিয়ে তা বাজারে পৌঁছে দিয়েছেন, আবার কেউ বাজারে সাজিয়ে রেখেছেন। আমাদের রান্নাঘরে একটি সবজি পৌঁছনোর আগেই তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বহু মানুষের জীবন।
সেই কৃষক হয়তো কোনও দিন আমাদের শহরে আসেননি। গাড়ির চালক হয়তো আমাদের নাম জানেন না। সবজি বিক্রেতা হয়তো কোনও দিন আমাদের বাড়িতেও আসবেন না। অথচ, আমাদের প্রতিদিনের খাবারের জোগানে তাঁদের প্রত্যেকের অবদান রয়েছে।
তাঁরা কেউ সকালে উঠে ঘোষণা করেননি যে দেশের সেবা করতে যাচ্ছেন। তাঁরা কেবল সৎভাবে রোজগার করে নিজেদের পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়েই তাঁরা আমাদের পরিবারের খাবারের ব্যবস্থাও করেছেন।
এটাও কি এক ধরনের দেশসেবা নয়? এবার ভাবুন, আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটি যিনি পরিষ্কার করেন, তাঁর কথা। আমরা পরিষ্কার রাস্তা দেখতে পাই, কিন্তু যিনি সেটি পরিষ্কার করেছেন, তাঁকে প্রায়ই উপেক্ষা করি। আবর্জনা পরিষ্কার না হলে আমাদের চোখে পড়ে, কিন্তু নিয়মিত পরিষ্কারের কাজটি ঠিকঠাক হলে সেই শ্রমের কথা মনে রাখি না।
হাসপাতালের কোনও কর্মী রোগীর বিছানার চাদর বদলে দেন। বাসচালক শিশুদের নিরাপদে স্কুলে পৌঁছে দেন। কোনও মেকানিক অ্যাম্বুল্যান্স মেরামত করেন। একজন মা তাঁর সন্তানকে মিথ্যা না বলতে শেখান। কোনও শিক্ষক দুর্বল পড়ুয়াকে সাহায্য করার জন্য নির্ধারিত সময়ের পরেও থেকে যান। আবার কোনও পথচারী ব্যস্ত রাস্তা পার হতে এক বৃদ্ধাকে সাহায্য করেন।
এই কাজগুলির কোনওটিই হয়তো ইতিহাসের বইয়ে জায়গা পাবে না। কেউ পদক দেবেন না, হাততালি পড়বে না, ছবি উঠবে না, বক্তৃতাও হবে না। কিন্তু একবার ভাবুন, এই মানুষগুলি যদি মাত্র এক দিনের জন্যও নিজেদের কাজ বন্ধ করে দেন, তাহলে কী হবে? তখনই আমরা বুঝতে পারব, যাঁদের আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি, তাঁদের উপর আমাদের দৈনন্দিন জীবন কতটা নির্ভরশীল।
এখান থেকেই উঠে আসে আরও গভীর একটি প্রশ্ন—একটি দেশ আসলে কী? আমরা সাধারণত দেশের কথা বলতে গিয়ে পাহাড়, নদী, শহর, গ্রাম এবং সীমান্তের কথা বলি। এগুলি সবই দেশের অংশ। কিন্তু দেশের প্রকৃত পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সেই সীমানার মধ্যে বসবাসকারী মানুষদের পারস্পরিক সম্পর্কও।
অচেনা কারও কাছ থেকে খাবার কেনার সময় যে বিশ্বাস কাজ করে, অন্য কাউকে বিপদে পড়তে দেখে থেমে যাওয়ার যে মানবিকতা, দোকানদারের ওজন মাপার যন্ত্রের উপর ক্রেতার যে আস্থা কিংবা কেউ দেখছেন না জেনেও নিজের কাজ ঠিকভাবে শেষ করার যে দায়িত্ববোধ—এসবের মধ্যেও দেশের পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে। দেশ শুধু আমাদের পায়ের নীচের মাটি নয়। সেই মাটির উপর আমরা একে অপরের জন্য কেমন জীবন তৈরি করছি, সেটাও দেশের পরিচয়ের অংশ।
সাংবাদিকতার দীর্ঘ জীবনে আমি দেশকে দেখেছি নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। কোনও দিন সংবাদে উঠে এসেছে বড় কোনও সাফল্যের কথা। অন্য কোনও দিন খবরের শিরোনামে জায়গা পেয়েছে সংঘাত, হতাশা, ক্ষতি কিংবা অনিশ্চয়তা। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কথা বলেছেন, সিদ্ধান্ত ঘোষণা হয়েছে, বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং শেষও হয়েছে।
কিন্তু এসবের বাইরেও আরও একটি দেশ নীরবে বেঁচে থাকে। সেখানে মানুষ সকালে ঘুম থেকে ওঠেন, সকালের খাবার তৈরি করেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠান, দোকান খোলেন, কাজে যান, পরিবারের যত্ন নেন এবং কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ান।
ক্যামেরা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু দেশের জীবন থেমে থাকে না। এই নীরব অবদানের সবচেয়ে সুন্দর দিক হল, অনেক মানুষ নিজেরাও বুঝতে পারেন না যে তাঁরা দেশ গঠনে ভূমিকা রাখছেন। একজন মা যখন সন্তানকে সত্যি কথা বলতে শেখান, তখন তিনি হয়তো ভাবেন না যে দেশ গড়ার কাজ করছেন। তিনি কেবল একজন ভালো মানুষ তৈরি করতে চান। কিন্তু সেই সন্তানই একদিন কারও প্রতিবেশী, সহকর্মী, নিয়োগকর্তা, কর্মচারী কিংবা বন্ধু হয়ে উঠবে। বাড়িতে শেখা সততার শিক্ষা ছড়িয়ে পড়তে পারে আরও শত শত মানুষের জীবনে। খাবার টেবিলে দেওয়া একটি ছোট শিক্ষা যে কত দূর পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে, তা আমরা অনেক সময় কল্পনাও করতে পারি না।
দৈনন্দিন জীবনে দেশপ্রেম দেখতে কেমন?
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। প্রত্যেকটি কাজই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশসেবা হয়ে ওঠে, তা নয়। কোনও দোকানদার ক্রেতাদের ঠকিয়ে শুধু দোকান চালান বলেই দেশের সেবা করছেন, এমন দাবি করতে পারেন না। সরকারি অর্থের অপব্যবহার করে কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন বলেই তাঁর কাজকে দেশপ্রেম বলা যায় না। অন্যদের আঘাত করে কেউ শুধু দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা জোরে জোরে বললেই প্রকৃত দেশপ্রেমিক হয়ে ওঠেন না।
আমরা কী কাজ করছি, শুধু সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কীভাবে কাজ করছি এবং আমাদের কাজ অন্যদের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন দোকানদার ক্রেতাকে সঠিক দাম ফেরত দিচ্ছেন। কাজটি সাধারণ, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কোনও কর্মী স্কুল তৈরি করার সময় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করতে অস্বীকার করছেন। তিনি হয়তো সেই শিশুদের কোনও দিন চিনবেনও না, কিন্তু তাঁর সততা তাদের নিরাপত্তা রক্ষা করছে।
কোনও সরকারি আধিকারিক ধনী ব্যক্তির মতোই দরিদ্র মানুষকেও সমান সম্মান দিচ্ছেন। তিনি একটি মূল্যবান বিষয়কে রক্ষা করছেন। কোনও নাগরিক নিজের প্রাপ্য কর সততার সঙ্গে জমা দিচ্ছেন। তিনি যৌথ পরিষেবাগুলির অর্থ জোগাতে সাহায্য করছেন, যদিও তাঁর দেওয়া অর্থ ঠিক কোথায় খরচ হচ্ছে, তা হয়তো তিনি কখনও জানতে পারবেন না। আমাদের পদ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, শুধু তার ভিত্তিতে দেশপ্রেমের বিচার হয় না। আমাদের আচরণের সততার মধ্যেও দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়।
আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে, যা আমাদের ভাবনার আরও গভীরে নিয়ে যায়। আমরা কখনও কখনও নিজেদের দেশপ্রেম প্রমাণ করার প্রয়োজন অনুভব করি কেন? আমরা চাই অন্যরা আমাদের অনুভূতি দেখুক। আমরা ভালো নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চাই। দেশপ্রেম সম্পর্কে অন্য কারও ধারণা আমাদের মতের সঙ্গে না মিললে আমরা ক্ষুব্ধও হয়ে উঠতে পারি।
কিন্তু একই দেশকে ভালোবেসেও দু’জন মানুষ সেই দেশের জন্য কোনটি সবচেয়ে ভালো, তা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন। একজন বাবা ও মা তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন। তার মানে এই নয় যে তাঁদের মধ্যে একজন সন্তানকে কম ভালোবাসেন। ভালোবাসা মানেই সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। কখনও কখনও ভালোবাসা থেকেই কঠিন প্রশ্ন উঠে আসে। আর সম্ভবত এখানেই ব্যক্তিগত জীবনে দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আমি কি নিজের সঙ্গে প্রবল মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অন্য এক নাগরিককে সম্মান করতে পারি? আমি কি স্বীকার করতে পারি যে তাঁর অধিকারও আমার অধিকারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ? যাঁকে আমি পছন্দ করি না, তাঁর ক্ষেত্রেও কি ন্যায্যতার পক্ষে দাঁড়াতে পারি?
সংবিধানের সূচনা হয়েছে ‘আমরা, ভারতের জনগণ’—এই ধারণা দিয়ে। কথাগুলি অত্যন্ত সহজ, অথচ গভীর অর্থবহ। সেখানে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, ধনীতম পরিবার কিংবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীর কথা দিয়ে শুরু করা হয়নি। শুরু হয়েছে আমাদের সবাইকে নিয়ে।
এই দেশের মানুষ নিজের দেশেই বহিরাগত নন। এই দেশ তাঁদেরও। তাই অন্য কোনও নাগরিকের ভাষা, ধর্মবিশ্বাস, মতামত, আয় কিংবা জীবনযাপনের ধরন আমাদের থেকে আলাদা বলে তাঁর মর্যাদা কমে যেতে পারে না।
এবার দু’জন প্রতিবেশীর কথা ভাবুন। একজন প্রতিদিন গর্বের সঙ্গে দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা বলেন। প্রতিটি জাতীয় উদযাপনে যোগ দেন। দেশপ্রেম প্রকাশের কোনও সুযোগই হাতছাড়া করেন না। অথচ, নিজের কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন, সুযোগ পেলেই মানুষকে ঠকান এবং কোনও লাভ না থাকলে কাউকে সাহায্য করতে চান না।
অন্য প্রতিবেশী দেশপ্রেম নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না। কিন্তু কর্মচারীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেন, নিজের আশপাশ পরিষ্কার রাখেন, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং সন্তানদের অন্যদের সম্মান করতে শেখান। এই দু’জনের মধ্যে কে দেশের জন্য বেশি কাজ করছেন?
এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে প্রকাশ্যে দেশপ্রেমের কথা বলা অর্থহীন। এ ধরনের প্রকাশ মানুষকে একত্রিত করতে পারে, অনুপ্রাণিত করতে পারে। কিন্তু প্রতিদিনের আচরণে সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটলে তার তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়। সম্ভবত আমরা মানুষকে কতটা দেশপ্রেমিক, তা নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে অনেক বেশি সময় ব্যয় করেছি। অথচ, সেই ভালোবাসা দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে প্রকাশ পাচ্ছে, তা জানতে চেয়েছি অনেক কম।
বিষয়টি আরও ব্যক্তিগতভাবে বোঝার একটি উপায় রয়েছে। নিজের জীবনে যাঁদের অবদান রয়েছে, তাঁদের কথা ভাবুন। যিনি আপনার খাবার উৎপাদন করেছেন। যিনি আপনার বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন। যে চালক আপনাকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন। আপনার প্রিয়জন অসুস্থ থাকার সময় যিনি হাসপাতাল পরিষ্কার করেছেন। কিংবা কোনও কঠিন দিনে যে অচেনা মানুষটি আপনাকে সাহায্য করেছেন।
হয়তো তাঁদের কারও নামই আপনি জানেন না। তাঁরাও হয়তো আপনার নাম জানেন না। তবুও আপনাদের জীবন এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কেউই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করি না। অনেক সময় নিজেরাও বুঝতে পারি না, অথচ আমরা একে অপরকে আগলে রাখছি।
আজ কতবার দেশপ্রেমিক হওয়ার সুযোগ পেয়েছি আমরা?
এই ভাবনা সাফল্যের সংজ্ঞাও বদলে দেয়। আমরা হয়তো বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার চেষ্টা করি, আরও বেশি উপার্জন করতে চাই, উঁচু পদে পৌঁছতে চাই এবং নিজের পরিচিতি তৈরি করতে চাই। ভালো করার ইচ্ছার মধ্যে কোনও ভুল নেই। কিন্তু জীবনের কোনও এক পর্যায়ে এসে আরও একটি প্রশ্ন মনে জাগে—আমি এত কিছু অর্জন করার পর, আমার উপস্থিতির কারণে পৃথিবীর কোন বিষয়টি একটু ভালো হয়েছে?
জীবনের শুরুতে থাকা একটি শিশু এবং জীবনের দিকে ফিরে তাকানো এক বৃদ্ধ—দু’জনের কাছেই এই প্রশ্ন সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিশুটি ভাবতে পারে, সে নিজের খাবার ভাগ করে খেয়েছে কি না কিংবা কোনও বন্ধুকে সাহায্য করেছে কি না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ভাবতে পারেন, তিনি অন্যদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করেছেন কি না, নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করেছেন কি না। আর একজন প্রবীণ মানুষ ফিরে তাকিয়ে মনে করতে পারেন, বছরের পর বছর নিজের যত্ন, কাজ এবং সহমর্মিতার মাধ্যমে কতজনের জীবন একটু সহজ করে তুলতে পেরেছেন। শুরু করার জন্য কারও বিশেষ পোশাক, বড় পদ কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই।
আজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে নিজের দিনটিকে একটু অন্যভাবে মনে করার চেষ্টা করুন। শুধু কত টাকা উপার্জন করেছেন, কত কাজ শেষ করেছেন কিংবা কতটা প্রশংসা পেয়েছেন, তার হিসাব করবেন না। মনে করার চেষ্টা করুন, দিনের কোন মুহূর্তে আপনার উপস্থিতি অন্য কারও কাজে লেগেছে। হয়তো আপনি ধৈর্য ধরে কারও কথা শুনেছেন। হয়তো নিজের কাজটি ঠিকঠাক করেছেন। হয়তো অন্যায় সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিংবা এমন কাউকে সাহায্য করেছেন, যিনি বিনিময়ে আপনাকে কিছুই দিতে পারবেন না।
লক্ষ লক্ষ মানুষের একটি দেশের কাছে এই মুহূর্তগুলি হয়তো খুবই ছোট বলে মনে হতে পারে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের দেশ আসলে এমনই লক্ষ লক্ষ ছোট ছোট মুহূর্তের সমষ্টি। কৃষক হয়তো কোনও দিন জানতে পারবেন না যে তিনি দূরের কোনও শিশুর মুখে খাবার তুলে দিতে সাহায্য করেছেন। রাস্তা পরিষ্কার করা কর্মী হয়তো সেই মানুষগুলির সঙ্গে কোনও দিন দেখা করবেন না, যাঁরা তাঁর পরিষ্কার করা রাস্তা দিয়ে নিরাপদে হেঁটে যান।
একজন মা হয়তো কোনও দিন জানতে পারবেন না, তাঁর সন্তানের সততা ভবিষ্যতে কত মানুষের জীবনকে স্পর্শ করবে। রাস্তা পার হতে সাহায্য পাওয়া বৃদ্ধা হয়তো কোনও দিন জানতে পারবেন না, তাঁকে সাহায্য করা অচেনা মানুষটির নাম কী। কিন্তু নিজেদের কাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে তাঁদের কারও নাম জানার প্রয়োজন নেই। তাঁদের করা ভালো কাজের মূল্য তাতে একটুও কমে যায় না।
সম্ভবত দেশপ্রেমের সৌন্দর্য এখানেই—এটি সব সময় গায়ে পরার, চিৎকার করে বলার, প্রদর্শন করার কিংবা ঘোষণা করার বিষয় নয়। কখনও কখনও আমরা কীভাবে জীবনযাপন করি, কতটা যত্ন অন্যকে দিতে পারি, নিজের কাজ কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে করি এবং অন্য মানুষের প্রতি কতটা ন্যায্য আচরণ করি, তার মধ্যেই দেশপ্রেম প্রকাশ পায়।
দাদুর হাতে এগিয়ে দেওয়া এক গ্লাস জল হয়তো গোটা দেশকে বদলে দিতে পারত না। কিন্তু সেই জল নিয়ে আসা ছোট ছেলেটি এমন একটি বিষয় বুঝতে শুরু করেছিল, যা ভবিষ্যতে মানুষের সঙ্গে তার আচরণ বদলে দিতে পারত।
যদি দেশের মানুষের প্রতি যত্নশীল হওয়ার মধ্য দিয়েই দেশসেবার শুরু হয়, তাহলে আজ আমরা কতবার নিজেদের অজান্তেই দেশপ্রেমিক হওয়ার সুযোগ পেয়েছি?