
নয়া দিল্লি: কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আদালতে সম্পূর্ণ তথ্য দিচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূল কংগ্রেসের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের মামলায় সওয়াল করলেন তৃণমূলের আইনজীবী কপিল সিব্বল। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এম. এম. সুন্দরেশ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি. ভারালের ডিভিশন বেঞ্চে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ মামলার শুনানি ছিল। তৃণমূলের পার্টি চালাতে মাসিক খরচ কত সেই খতিয়ান তুলে ধরে সওয়াল করলেন কপিল সিব্বল।
তখন ইডি-র তরফে আইনজীবী সওয়াল করেন, ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্ট বাদে বাকি অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা নিয়ে কাজ চালাতে পারে তৃণমূল। আইনজীবী কপিল সিব্বল বলেন, “ওরা আমাদের বলছে বাকি অ্যাকাউন্টে ১৬৪ কোটি টাকা আছে। সেখান থেকে টাকা ব্যবহার করতে। কিন্তু যে ৩৬ টি অ্যাকাউন্টের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে ৩১ টি ফিক্সড ডিপোজিট। বাকি ৫ টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। যদি ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙা হয়, তাহলে সেই অর্থ বাজেয়াপ্ত হওয়া অ্যাকাউন্টে চলে যাবে।” তখন তিনি বলেন, “এরমধ্যে চারটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ওরা আদালতে সব তথ্য জানাচ্ছে না।”
কপিল সিব্বলের দাবি, ওদের দায়ের করা মামলা অনুযায়ী, প্রসিড অফ ক্রাইম-এর পরিমাণ ৬০ কোটি টাকা। কিন্তু তারা ব্যাঙ্কে ৪০০ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করে রেখেছে। কেন সব টাকা বাজেয়াপ্ত করা হবে? আমি আমার কর্মচারীদের স্যালারি দিতে পারছি না।
তিনি আদালতে জানান, তৃণমূল কংগ্রেসের মোট আড়াইশো জন কর্মচারী আছে, যাদের এই মাসে মাইনে দেওয়া সম্ভব হয়নি। মাইনে-সহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট ৫৩ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা প্রয়োজন। এছাড়াও অফিসের কাজ চালানোর জন্য অন্যান্য কর্মচারী এবং সিকিউরিটি এজেন্সিকে চুক্তিভিত্তিতে টাকা দেওয়ার কথা। তৃণমূল কংগ্রেসের ১৭ টি অফিস মিলিয়ে মাসে এক কোটি টাকার খরচ আছে। নির্বাচনের সময় যারা কাজ করেছেন তাদের টাকা দেওয়া এখনও বাকি আছে।
তিনি আদালতে জানান, “কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল জাজ বলেছেন, প্রতিদিনের কাজ চালানোর জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিকে স্পেশাল অফিসার হিসাবে নিয়োগ করে কিছু টাকা ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। যখনই কলকাতা হাইকোর্ট এই অ্যাকাউন্ট ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, তখন এই তিনটে অ্যাকাউন্টকেও নতুন করে ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে।”
আদালতে তিনি এও জানান, তৃণমূলের তরফে একটি সংস্থা থেকে এয়ারক্রাফ্ট নিয়েছে। সেই কোম্পানির অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। কিসের ভিত্তিতে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে তা তারা জানাচ্ছেন না।
ইডির তরফে আইনজীবী এস ভি রাজু আদালতে সওয়াল করেন, “ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কে যে টাকা আছে, সেখানে ইডি হস্তক্ষেপ করেনি। ৯ জুলাইয়ের নির্দেশে হাইকোর্ট প্রতিদিনের খরচের জন্য নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়াও কোন পক্ষ প্রকৃত তৃণমূল তা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে।
তখন বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ বলেন, “কোন পক্ষ প্রকৃত তৃণমূল, তা নিয়ে আমাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। প্রতিদিনের খরচের জন্য হাইকোর্ট কী নির্দেশ দিয়েছে? আমরা সেটা জানতে চাই।”
ইডি তরফে তখন জানানো হয়, “হ্যাঁ, এই দুটো অ্যাকাউন্ট ইডি বাজেয়াপ্ত করেনি।” তখন কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের আইনজীবী কপিল সিব্বল বলেন, “ব্যাঙ্ক আমাদের জানিয়েছে, অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।”
ইডির পক্ষে এস ভি রাজু তখন জানান, তারা এ বিষয়ে হলফনামা জমা দেবে।
তখন কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের আরেক আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী বলেন, “যে দুটি অ্যাকাউন্টের কথা বলা হচ্ছে, এর মধ্যে একটি সংবাদপত্রের অ্যাকাউন্ট। অন্যটি পার্টি সদস্যদের চাঁদার ওয়েলফেয়ার অ্যাকাউন্ট। যদি আমরা সেই অ্যাকাউন্টের টাকা অন্য খাতে মাইনে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করি, তখন ইডি বলবে আমরা তহবিল তছরুপ করেছি।”
এদিন আদালতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের তরফে সওয়াল করেন আইনজীবী কে পরমেশ্বর। তিনি বলেন, “সব অ্যাকাউন্ট এ বড় ধরনের আর্থিক কারচুপি হয়েছে। কে প্রকৃত তৃণমূল তা নিয়ে এখন দ্বন্দ্ব চলছে। এই বিষয় নির্বাচন কমিশনে বিচারাধীন।
যতক্ষণ পর্যন্ত না কে প্রকৃত তৃণমূল তা ঠিক হচ্ছে, ততক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ অনুযায়ী, এক পক্ষকে অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে না। আমাদের বক্তব্য কলকাতা হাইকোর্টেও উত্থাপন হয়েছিল। কিন্তু আমাদের গুরুত্ব না দিয়ে হাইকোর্ট অর্ডার দিয়েছে।”
তখন কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের আইনজীবী কপিল সিব্বল বলেন, “এয়ারলাইন্স কোম্পানিকে টাকা দিতে হবে। কিন্তু সেই এয়ারলাইন্স কোম্পানির বিরুদ্ধেও প্রশ্ন উঠছে। সন্দেহের তালিকায় আছে।”
সওয়াল জবাবের শেষে বিচারপতি সুন্দরেশের পর্যবেক্ষণ, “কলকাতা হাইকোর্টের ৯ জুলাইয়ের নির্দেশ যথাযথ। টাকা দেওয়া হবে কী, হবে না সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন কলকাতা হাইকোর্ট নিযুক্ত স্পেশাল অফিসার।”
ঋতব্রতপন্থী বিধায়ক বিশ্বনাথ দাসের আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্দেশ, “কলকাতা হাইকোর্টনিযুক্ত স্পেশাল অফিসারের কাছে যাবতীয় আপত্তির বিষয় উত্থাপন করুন। তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।” অর্থাৎ কলকাতা হাইকোর্টের ৯ জুলাই নির্দেশকে মান্যতা দিল সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্বস্তি মমতাপন্থী তৃণমূলের।