
নয়াদিল্লি: তিনি বিধায়ক। তাঁর স্বামী সাংসদ। দু’জনেই এখন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধদের দলে। কিন্তু, কেন বিক্ষুব্ধদের দলে নাম লেখালেন? এই নিয়ে মুখ খুললেন সিতাইয়ের তৃণমূল বিধায়ক সঙ্গীতা রায়। শুক্রবার দিল্লিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হলেন তিনি। মুখ খুললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়েও। কী বললেন সিতাইয়ের বিধায়ক?
কেন বিক্ষুব্ধদের দলে নাম লেখালেন সঙ্গীতা রায়?
সিতাইয়ের বিধায়ক সঙ্গীতা রায়ের স্বামী জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া কোচবিহারের সাংসদ। তিনি লোকসভায় তৃণমূলের বিক্ষুব্ধদের দলে নাম লিখিয়েছেন। একইরকমভাবে সঙ্গীতা বিধানসভায় বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে রয়েছেন। ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে তিনি দেখা করেননি জানিয়ে সঙ্গীতা বলেন, “আমাকে কালীঘাটে অনেকবার ডেকেছিল। আমি যাইনি। ফলে আমি সই করিনি। শপথের আগেও একবার ডেকেছিল। বলেছিল, কালীঘাটে আসুন, কথা রয়েছে। আমি যাইনি। আমি ফল ঘোষণার পর কলকাতায় এসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি শুভেন্দুদার দলে। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কারণ, ১৫ বছরে অনেক বিপদ গিয়েছে। কেউ সাহায্য করেনি। আমি যদি ওদের কাছ থেকে সাহায্য না পাই, তাহলে আমার নেতার কী দরকার? সেজন্য কলকাতায় এসেই সিদ্ধান্ত নিই, শুভেন্দুদার সঙ্গে কথা বলব। আমি শুনেছি, আমার সই হয়েছে। কিন্তু, আমি সই করিনি।”
এরপরই ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “গণনার দিন আমার সবচেয়ে কষ্ট হয়েছে। সারাদিনে এক ফোঁটা জল খেতে দেয়নি। আমি যখন জিতছি, তখন জোর করা হয়, কাউন্টিং হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু, আমি বেরিয়ে আসিনি। আমি যখন বেরিয়ে আসি, আমার সঙ্গে চারজন ছিল। তাঁদের মারতে উদ্যত হয়। আমি আবার কাউন্টিং সেন্টারে ফিরে যাই। একজনের কাছ থেকে ফোন পেয়ে আমার সাংসদ স্বামীকে ফোন করি। বলি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলো যেন আমাকে এখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। উনি অনেকবার ফোন করেন। কিন্তু, কেউ উত্তর দেননি। রিটার্নিং অফিসারের কাছে গেলাম। এসডিপিও সাহেবকে অনুরোধ করলাম, কাউন্টিং হল থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার জন্য।”
‘ছেলের কথা জানতে চাননি মমতা’
সঙ্গীতা রায় বলেন, “জেতার পরদিন অভিষেক, মমতা কেউ ফোন করে আমার খোঁজ নেনি। তাতে একটা ক্ষোভ জন্মে। ছেলেকে বাড়িতে রেখে কলকাতায় শপথ নিতে যাই। আমি জানিয়েছিলাম, আমার ছেলের কিডনিতে স্টোন হয়েছে। দিল্লি নিয়ে যাব। কিন্তু, জানতে চায়নি, ছেলে কেমন আছে। দিল্লিতে অস্ত্রোপচার হয়। কিন্তু, তারা বুঝতে চাইল না আমি সত্যি বলছি না মিথ্যে বলছি। এই জায়গায় আমার ক্ষোভ। একজন মা কখনও তাঁর সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে কখনও মিছিমিছি বলতে পারে না স্টোন হয়েছে। আবার আমার ছেলের ছবি তুলে পাঠাতে হয়েছে। সেটা অবশ্য আমার কাছে চাননি।” প্রসঙ্গত, ডেরেক ও’ব্রায়েনকে ছেলের ছবি তুলে পাঠিয়েছেন জগদীশ।
তিনি জানান, “এলাকার আমার ২০০ জন কর্মীকে বাঁচাতে হবে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ফোন পেলাম। আমার ছেলের প্রতি তাদের যদি সমবেদনা না থাকে, আমার যে ২০০ কর্মী বাইরে রয়েছে, তাদের প্রতি তো সমবেদনা থাকবে না। তারপর আমি ঋতব্রতর সঙ্গে ওদের সঙ্গে গেলাম।”
শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে কী বললেন সঙ্গীতা রায়?
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসা করে সঙ্গীতা বলেন, “আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার, দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আমি দেখা করার পর উনি এত ভালো ব্যবহার করলেন, আমি এটা আশা করিনি। উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ছেলে কেমন রয়েছে? আমি বলি, ভালো রয়েছে। ১৮ তারিখ চেকআপের পর বাড়ি যাব। উনি বললেন, না এখনই বাড়ি নিয়ে যাবেন না। কটা দিন থাকুন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে মনের দুঃখটা বলতে পারলাম। আমার ২০০ জন কর্মীর কথা বললাম। উনি বললেন, কোনও চিন্তা করবেন না। তাঁর কাছ থেকে এই যে আশ্বাস পেলাম, আমি মনে করছি, একজন লিডার এমনই হওয়া উচিত।” এরপরই তিনি বলেন, “বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়ে ভরসা পাচ্ছি, ভয় পাচ্ছি না। তাঁর কাছে মনের কথা বলতে পারব। এলাকার কথা বলতে পারব। তিনি পরে কী করবেন, সেটা পরের ব্যাপার।”
মমতা ও অভিষেককে নিয়ে কী বললেন সঙ্গীতা?
মমতা ও অভিষককে নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে সিতাইয়ের বিধায়ক বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের সঙ্গে কোনওদিনই কথা বলতেন না। আমার স্বামী মার খেয়েছেন, বাড়ি ভাঙচুর হয়েছেন। কোনওদিন খোঁজ নেননি। আমাকে অভিষেক কোনওদিন ফোন করেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন করার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমি নিজে আমার এলাকার উন্নয়নের জন্য একটা দমকম, কলেজের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গিয়েছিলাম। উনি আমার সঙ্গে কথা বলেননি। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারপরও আমি আবেদন করতে তিনি বলেন, ‘এখানে নয়, এখানে নয়। নবান্নে যান।’ মাতৃসুলভ মনোভাব, লিডার মনোভাব তাঁর মধ্যে পাইনি।” একইসঙ্গে তিনি জানিয়ে দেন, “আমাকে কেউ গদ্দার বলুক, সুবিধাবাদী বলুক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”