
দিল্লির একটি আবাসনের এক মহিলা প্রতিদিন সকালে রান্নাঘরের বর্জ্য যত্ন করে দু’টি আলাদা ডাস্টবিনে রাখেন—একটি সবুজ, অন্যটি নীল। আবাসনের নোটিস বোর্ডে দেওয়া নির্দেশ মেনেই এই কাজ করেন তিনি। তাঁর ধারণা, এই বাছাইয়ের গুরুত্ব রয়েছে। এর ফলে তাঁর ফেলে দেওয়া বর্জ্য দু’টি আলাদা পথে যাবে এবং যথাযথভাবে প্রক্রিয়াকরণ করা হবে। কিন্তু বেশিরভাগ দিনই দেখা যায়, দু’টি ডাস্টবিনের বর্জ্য পৌরসভার একই গাড়িতে তোলা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে মিশছে শহরের প্রান্তে গড়ে ওঠা একই আবর্জনার পাহাড়ে।
ভারতে প্রতিদিন ১ লক্ষ ৫৯ হাজার টনেরও বেশি বর্জ্য হয়। গোটা বছরের হিসাবে জাতীয় অনুমান বলছে, এই পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ২০ লক্ষ টন। এত বিপুল বর্জ্যের মধ্যে পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় প্রথমে সংগ্রহ করা হয় মাত্র ৪ কোটি ৩০ লক্ষ টন। সংগৃহীত বর্জ্যের মধ্যে মাত্র ১ কোটি ২০ লক্ষ টন বর্জ্য ফেলার আগে কোনও না কোনওভাবে যথাযথ প্রক্রিয়াকরণের মধ্য দিয়ে যায়। বাকি ৩ কোটি ১০ লক্ষ টন সরাসরি ফেলে দেওয়া হয় খোলা ডাম্পিং গ্রাউন্ডে।
সব মিলিয়ে, ভারতের মোট বর্জ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ সঠিকভাবে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। বাকি ৮০ শতাংশেরও বেশি হয় সংগ্রহ করার পরেও বিনা প্রক্রিয়াকরণে ফেলে দেওয়া হয়, নয়তো আদৌ সংগ্রহ করা হয় না।
আপনার ফেলে দেওয়া আবর্জনা আসলে কোথায় যায়?
এটা কোনও ব্যক্তির অসচেতনতার গল্প নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এমন এক পরিকাঠামোগত সমস্যা, যা ভারতের ক্রমবর্ধমান বর্জ্যের পরিমাণের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। দেশজুড়ে যথাযথভাবে নির্মিত ও নিয়ন্ত্রিত স্যানিটারি ল্যান্ডফিলের তুলনায় অনিয়ন্ত্রিত খোলা ডাম্পিং গ্রাউন্ডের সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বেশি। স্যানিটারি ল্যান্ডফিল এমনভাবে তৈরি ও পরিচালনা করা হয়, যাতে বর্জ্য নিরাপদে রাখা যায় এবং তা পচে তৈরি হওয়া বিষাক্ত তরল—যাকে লিচেট বলা হয়—সংগ্রহ করে তার দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
অন্যদিকে, খোলা ডাম্পিং গ্রাউন্ডে এই ধরনের কোনও সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে না। সেখানে বছরের পর বছর ধরে কোনও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই আবর্জনার স্তূপ বাড়তে থাকে। বর্জ্য থেকে নির্গত দূষক মিশে যায় মাটি ও ভূগর্ভস্থ জলে। কখনও কখনও স্তূপের ভিতরে জমতে থাকা মিথেন গ্যাসের কারণে আগুনও লেগে যায়।
এক দিনের আবর্জনার কথা ভেবে দেখুন। ভারতের প্রায় যে কোনও শহরের কোনও পরিবারের ফেলে দেওয়া একটি সবজির খোসা, একটি প্লাস্টিকের মোড়ক এবং একটি ভাঙা খেলনা—তিনটিই সম্ভবত একই ব্যাগে ভরে একই গাড়িতে তোলা হয়। তারপর সেগুলি পৌঁছে যায় একই খোলা ভাগাড়ে।
সেখানে সবজির খোসাটি, যা থেকে সহজেই উপযোগী জৈব সার তৈরি করা যেত, প্লাস্টিকের সঙ্গে মিশে থাকা আবর্জনার পাহাড়ের মধ্যে পচতে থাকে। এর ফলে নির্গত হয় মিথেন—একটি গ্রিনহাউস গ্যাস, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। অথচ এই বর্জ্য থেকে কোনও উপযোগী সামগ্রীও তৈরি হয় না।
প্লাস্টিকের মোড়কটি পরিষ্কার ও আলাদা করে রাখা হলে পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হত। কিন্তু জৈব বর্জ্যের সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর সেটিকে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। আর ভাঙা খেলনাটি? সেটি কার্যত স্থায়ীভাবে সেখানেই পড়ে থাকে। কারণ, বেশিরভাগ প্লাস্টিকের পচে মিশে যেতে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এই একটি মিশ্র বর্জ্যের ব্যাগ, প্রতিদিন কয়েক কোটি পরিবারের ফেলে দেওয়া একই ধরনের বর্জ্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে, ভারতের বড় বড় শহরের প্রান্তে বিশ্বের বৃহত্তম আবর্জনার পাহাড়গুলির কয়েকটি তৈরি করছে। সেগুলির মধ্যে অনেকগুলিই এখন আশপাশের বহুতল ভবনের চেয়েও উঁচু। কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা যায় সেই স্তূপ। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেগুলি এখনও ক্রমশ বড় হচ্ছে।
আমাদের বর্জ্যের মূল্য আসলে কাদের চোকাতে হয়?
এই আবর্জনার পাহাড়ের সবচেয়ে কাছাকাছি যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের অধিকাংশই কিন্তু সেই বর্জ্যের সিংহভাগ উৎপাদন করেন না। বড় বড় ডাম্পিং গ্রাউন্ডের আশপাশে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে অনেকেই ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের শ্বাস নিতে হয় ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকা আবর্জনা থেকে নির্গত দূষিত বাতাস। আবার বহু ক্ষেত্রে বছরের পর বছর অপরিশোধিত বর্জ্য থেকে তৈরি লিচেট মিশে দূষিত করে দিয়েছে তাঁদের নির্ভরতার ভূগর্ভস্থ জলের উৎসকেও।
নিজের বাড়ির দরজা থেকে একটি ভর্তি আবর্জনার ব্যাগ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার যে সুবিধা আমরা পাই, তার মূল্য নীরবে চোকাতে হয় অন্য কাউকে। সাধারণত কয়েক কিলোমিটার দূরে বসবাসকারী কোনও দরিদ্র পরিবারকে।
এ ক্ষেত্রেও সরকারের বাস্তব উদ্যোগ রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে স্বচ্ছ ভারত মিশনের মাধ্যমে শহর ও গ্রামাঞ্চলে বাড়িতে শৌচাগারের সুবিধা এবং সংগঠিত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য সাফল্য।
কিন্তু শুধুমাত্র বর্জ্য সংগ্রহ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সংগৃহীত বর্জ্যকে যথাযথভাবে প্রক্রিয়াকরণ করাও জরুরি। অন্যদিকে, ভারতে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ক্রমশ বাড়বে বলেই অনুমান করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের (CPCB) অনুমান অনুযায়ী, প্রক্রিয়াকরণের পরিকাঠামো বর্তমানের তুলনায় অনেক দ্রুত সম্প্রসারিত না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে বছরে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে ১৬ কোটি ৫০ লক্ষ টনে পৌঁছতে পারে।
ব্যবস্থাই যদি আবার বর্জ্য মিশিয়ে দেয়, তা হলে আলাদা করে রাখার কি কোনও অর্থ আছে?
একটি পরিবারের পক্ষে সত্যিটা কিছুটা হতাশাজনক। আপনি যত যত্ন করেই নিজের বর্জ্য আলাদা করে রাখুন না কেন, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পৌরসভার গাড়িটি যদি সেই বর্জ্য আবার একসঙ্গে মিশিয়ে দেয়, তা হলে আপনার প্রচেষ্টার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। তাই স্থানীয় স্তরে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন তোলা দরকার। আপনার শহরে বর্জ্য কি পুরো প্রক্রিয়াজুড়েই আলাদা রাখা হয়? আবর্জনা তোলার গাড়িতে, বর্জ্য স্থানান্তরের কেন্দ্রে এবং শেষ পর্যন্ত তা যেখানে ফেলা হয়, সেখানেও কি বর্জ্য আলাদা রাখার ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে? নাকি শুধুমাত্র রান্নাঘরের ডাস্টবিনেই এই নিয়ম মানা হচ্ছে?
ভারতের কিছু শহরে বর্জ্য পৃথকীকরণের ব্যবস্থা সত্যিই ভালোভাবে কাজ করে। কিন্তু এখনও বহু শহরে সেই ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। আর স্থানীয় প্রশাসনকে প্রশ্ন না করলে একজন বাসিন্দার পক্ষে অনেক সময় জানারও উপায় থাকে না, তিনি ঠিক কোন ধরনের শহরে বাস করছেন।
পরের বার আপনার বাড়ির সামনে থেকে আবর্জনার গাড়িটি চলে যাওয়ার সময় একবার অন্তত ভাবতে পারেন—সেটি আসলে কোথায় যাচ্ছে? আর সেখানে পৌঁছনোর পর আপনার ফেলে দেওয়া বর্জ্যের কী হচ্ছে?
সূত্র: দ্য এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (TERI)—দেশে কঠিন বর্জ্য উৎপাদন, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের পরিসংখ্যান; কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ (CPCB)—বর্জ্য উৎপাদন সংক্রান্ত পূর্বাভাস; ভারতের স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও খোলা ডাম্পিং গ্রাউন্ডের অনুপাত এবং স্বচ্ছ ভারত মিশনের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন।