
যে কোনও পরিবারে ‘হেড অফ দ্য ফ্যামিলি’ হন বাবারাই। আর বাড়ি কর্তাই যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে সবটাই ওলট-পালট হয়ে যায়। ধরুন বাবার হঠাৎ অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়েছে। তড়িঘড়ি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হল। সেই মুহূর্তে পরিবারের সদস্যদের মাথায় একটাই চিন্তা, তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন তো? চিকিৎসার খরচ কত হবে, সেই প্রশ্নটা তখন আর মাথায় আসে না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়। হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়ার সময় দেখা যায়, চিকিৎসার খরচ মেটাতে কাউকে এক টুকরো জমি বিক্রি করতে হচ্ছে। কখনও আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার করতে হচ্ছে টাকা। এমনকী, টাকার অভাবে মেয়ের বিয়েও পিছিয়ে দিতে হয়েছে অনেককে। ভারতে এমন ঘটনা মোটেই বিরল নয়। বরং বহু পরিবারের কাছে এটাই কঠিন বাস্তব।
২০২২-২৩ সালের সরকারি সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ভারতের গ্রামীণ এলাকায় হাসপাতালে ভর্তির খরচের ৯২ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭৭ শতাংশ সরাসরি পরিবারের নিজস্ব অর্থ থেকে মেটানো হয়। অর্থাৎ বিমা কিংবা সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে নয়, চিকিৎসার বিপুল খরচ বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকেই। অন্যদিকে, ওয়ান হেলথ ট্রাস্টের (One Health Trust) প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, শুধুমাত্র চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৬ কোটি ৩০ লক্ষ ভারতীয় দারিদ্র্যের কবলে পড়েন। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, এই আর্থিক বোঝার সবচেয়ে বড় কারণ শুধু হাসপাতালে ভর্তির খরচ নয়, বরং ওষুধ কেনার পিছনে বিপুল ব্যয়।
৬ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ! সংখ্যাটা কোনও মাঝারি আকারের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান। অথচ প্রতি বছর এত মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে যাচ্ছেন চাকরি হারিয়ে কিংবা ফসল নষ্ট হওয়ার কারণে নয়, শুধুমাত্র অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা করাতে গিয়ে।
অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ক্যাটাস্ট্রফিক হেলথ এক্সপেন্ডিচার’ (Catastrophic Health Expenditure)। অর্থাৎ কোনও পরিবারের বার্ষিক মোট বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি অর্থ যদি চিকিৎসার পিছনে খরচ হয়, তাহলে এই সংজ্ঞা অনুযায়ী তা বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়। শুনতে বিষয়টি জটিল মনে হলেও বাস্তব ছবিটা অত্যন্ত সহজ এবং উদ্বেগজনক।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি অবসর নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পরিবারের কারও চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে তাঁকে আরও দু’বছর কাজ করতে হচ্ছে। কিংবা চিকিৎসার জন্য বিপুল টাকা খরচ হয়ে যাওয়ায় কোনও পরিবার হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে,কোন সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমাতে হবে।
অর্থাৎ এমন একটি অসুখ, যার উপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই, সেটাই একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক পরিকল্পনা ওলটপালট করে দিতে পারে।
তবে আশার কথাও রয়েছে। গত কয়েক বছরে ভারতে চিকিৎসার খরচের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টসের (National Health Accounts) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে দেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের ৬৪ শতাংশেরও বেশি সাধারণ মানুষকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হত। ২০২১-২২ অর্থবর্ষে সেই হার কমে ৪০ শতাংশের নীচে নেমেছে।
এই পরিবর্তনের পিছনে সরকারি স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু জাতীয় স্তরে পরিসংখ্যানের উন্নতি মানেই যে প্রতিটি পরিবার স্বস্তি পাচ্ছে, তা নয়।
ধরা যাক, কোনও পরিবার সরকারি বিনামূল্যের চিকিৎসা প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার মতো আর্থিকভাবে পিছিয়ে নেই। আবার আচমকা কয়েক লক্ষ টাকার হাসপাতালের বিল মেটানোর মতো সচ্ছলতাও নেই। এই দুইয়ের মাঝখানে থাকা পরিবারগুলির পরিস্থিতিই সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
দেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের গড় হিসাব যতই উন্নতির ইঙ্গিত দিক,হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রিয়জনের জন্য বিপুল অঙ্কের বিল মেটাতে গিয়ে সমস্যায় পড়া পরিবারের কাছে সেই পরিসংখ্যান খুব একটা স্বস্তি এনে দিতে পারে না।
বাড়ি কেনা, বিয়ের আয়োজন কিংবা সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণ নেওয়া-এই ধরনের বড় খরচের ক্ষেত্রে সাধারণত আগে থেকে পরিকল্পনা করার সুযোগ থাকে। কিন্তু অসুস্থতা কখনও সময় বুঝে আসে না। হঠাৎ করেই চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে বিপুল টাকা জোগাড় করতে হয়।
সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একদিকে চিকিৎসার খরচ বাড়তে থাকে, অন্যদিকে উপার্জনও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে একই সঙ্গে দুই দিক থেকে আর্থিক ধাক্কা সামলাতে হয় পরিবারকে। এই কারণেই স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, কোনও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা উন্নত, তা শুধু হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসকের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং একটি অসুখের কারণে সাধারণ পরিবারগুলি কতটা আর্থিক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত থাকছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া প্রয়োজন।
ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যে উন্নতি হয়নি, এমনটা নয়। গত কয়েক বছরে একাধিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যব্যয় বেড়েছে, চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বিমা প্রকল্পের আওতায় এসেছেন আরও বহু মানুষ। কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা পরিবারের সদস্যের চিকিৎসার জন্য যখন কাউকে জমি বিক্রি করতে হয়, তখন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির পরিসংখ্যান তাঁর কাছে খুব একটা অর্থবহ হয়ে ওঠে না।
প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসবে,যখন চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে কোনও পরিবারকে দীর্ঘদিনের সঞ্চয় শেষ করতে হবে না, ঋণের বোঝায় ডুবতে হবে না কিংবা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপস করতে হবে না। আজ কোনও পরিবার বড়সড় চিকিৎসার বিল সামলে আর্থিক বিপর্যয় এড়াতে পারলে, তার পিছনে অনেক সময়ই কাজ করে আর্থিক সামর্থ্য,সঠিক সময়ে সাহায্য পাওয়া কিংবা পরিস্থিতিগত সৌভাগ্য।