
নয়াদিল্লি: এর আগে আমরা জেনেছি, একজন সাংসদ কী কাজ করেন। এবার এমন একটা বিষয়, যা জানা আরও জরুরি। কারণ আপনার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগ বিষয়ের ক্ষেত্রে সম্ভবত আপনার বিধায়কের (MLA) ভূমিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একজন বিধায়ক (Member of the Legislative Assembly) বিধানসভার সদস্য। একজন সাংসদ যেখানে বড় একটি লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেখানে বিধায়ক তুলনামূলকভাবে ছোট একটি এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি সংসদে নয়, নিজের রাজ্যের বিধানসভায় কাজ করেন। আর একজন বিধায়ক যে বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করেন, তার অনেকটাই সরাসরি আপনার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত।
ভারতে একজন বিধায়কের দায়িত্ব কী?
ভারতের সংবিধান কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছে। প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি, মুদ্রা, রেলপথের মতো বড় জাতীয় বিষয়গুলি কেন্দ্রের অধীনে। মূলত এই বিষয়গুলিই একজন সাংসদের কাজের সঙ্গে বেশি যুক্ত।
অন্যদিকে পুলিশ, জমির রেকর্ড, কৃষি, জনস্বাস্থ্যের বড় একটি অংশ এবং স্কুলশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাজ্য সরকারের অধীনে। অর্থাৎ, যে পুলিশ আধিকারিক আপনার বাড়িতে আসেন, যে জমির রেকর্ডের উপর আপনার বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, আপনার এলাকার সরকারি হাসপাতাল এবং স্থানীয় কৃষক যে কৃষিনীতি মেনে চলেন—এই সবকিছুই দিল্লিতে বসা কারও চেয়ে আপনার রাজ্য সরকার এবং তার অংশ হিসেবে আপনার বিধায়কের সঙ্গে অনেক বেশি সম্পর্কিত।
MLA-র স্থানীয় উন্নয়ন তহবিল কীভাবে কাজ করে?
সাংসদদের মতো বিধায়করাও নিজেদের বিধানসভা এলাকার উন্নয়নের জন্য তহবিল পান। একে সাধারণভাবে MLALAD স্কিম বলা হয়। এটি অনেকটা সাংসদদের MPLADS-র মতো। ব্যবস্থাটিও প্রায় একই। কোনও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য বিধায়ক সুপারিশ করেন। এরপর স্থানীয় জেলা প্রশাসনের আধিকারিক সেই প্রকল্পে অনুমোদন দেন এবং তা বাস্তবায়ন করেন। অর্থাৎ, MLA নিজে সরাসরি সেই টাকা খরচ করেন না।
তবে এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই তহবিলের পরিমাণ গোটা দেশে এক নয়। আপনি কোন রাজ্যে থাকেন, তার উপরই এই অর্থের পরিমাণ নির্ভর করে। দিল্লিতে বর্তমানে বিধায়কদের জন্য বছরে ১৫ কোটি টাকা MLALAD তহবিল রয়েছে। যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। পঞ্জাব, কেরল ও রাজস্থানে এই পরিমাণ ৫ কোটি টাকা। অসম, ছত্তীসগঢ়, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকে তা ২ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, একই সংবিধানের অধীনে থাকা দুই ভারতীয় নাগরিক, দু’জনেরই একজন করে MLA থাকা সত্ত্বেও, তাঁদের বিধায়কদের স্থানীয় উন্নয়ন তহবিলের পরিমাণ কয়েক গুণ পর্যন্ত আলাদা হতে পারে। কারণ, এই সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারগুলি নিজেদের মতো করে নেয়।
MLA-র আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা আছে-
উন্নয়ন তহবিলের বাইরেও একজন বিধায়কের এমন একটি ক্ষমতা রয়েছে, যা সাংসদের থাকে না। কোনও বিধায়কের দল যদি রাজ্যে সরকার গঠন করে, তাহলে সেই MLA রাজ্যের মন্ত্রী হতে পারেন। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, কৃষি কিংবা স্বরাষ্ট্রের মতো কোনও দফতরের দায়িত্ব সরাসরি তাঁর হাতে আসতে পারে। অর্থাৎ, যে বিষয়গুলি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, সেগুলি পরিচালনার সরাসরি প্রশাসনিক ক্ষমতাও তাঁর হাতে থাকতে পারে।
বেশিরভাগ সাংসদ এভাবে সরাসরি কোনও দফতর পরিচালনার দায়িত্ব পান না। সংসদের ক্ষমতার বড় অংশই কার্যকর হয় বিতর্ক, আইন প্রণয়ন এবং সরকারের উপর নজরদারির মাধ্যমে।
MLA বনাম MP বনাম স্থানীয় প্রশাসন: কার দায়িত্ব কী?
তা হলে স্থানীয় কোনও সমস্যা হলে আমরা কেন প্রথমেই সাংসদের কথা ভাবি? কেন বিধায়কের কথা অনেক সময় মাথাতেই আসে না? এর একটা কারণ দৃশ্যমানতা। জাতীয় রাজনীতি রাজ্য বিধানসভার কার্যকলাপের তুলনায় অনেক বেশি টেলিভিশন কভারেজ পায়। আর একটি কারণ হল, MLA এবং MP—দুই পদই জনপ্রতিনিধির হওয়ায় তাঁদের কাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সহজেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
আর একটা বিষয় হল, আপনার এলাকার রাস্তা মেরামত বা নর্দমা পরিষ্কার করার দায়িত্ব আসলে MLA বা MP—কারওই নয়। আগের দু’টি পর্বে যেমন দেখা গিয়েছে, এই ধরনের কাজ সাধারণত পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের দায়িত্ব। অর্থাৎ, তিনটি আলাদা প্রতিষ্ঠান। তিন ধরনের দায়িত্ব।
স্বাস্থ্য, পুলিশ, জমি-সহ রাজ্যের বিভিন্ন বিষয়ে নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন একজন বিধায়ক। সাংসদ জাতীয় আইন প্রণয়ন করেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের উপর নজরদারি করেন। আর পৌরসভা বা পঞ্চায়েত রাস্তা তৈরি, নর্দমা পরিষ্কার-সহ স্থানীয় পরিষেবা পরিচালনা করে।
কোন সমস্যার দায়িত্ব কার, সেটা জানা নিছক কোনও ছোটখাটো বিষয় নয়। সঠিক জায়গায় অভিযোগ করা আর ভুল জায়গায় অভিযোগ করে যাওয়ার মধ্যে এটাই পার্থক্য তৈরি করে।
তাই একটা ছোট পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আপনার এলাকার এমন একটি সমস্যা ভাবুন, যা আপনাকে বেশ কিছুদিন ধরে বিরক্ত করছে। এবার নিজেকে প্রশ্ন করুন—এটা কি আমার MLA-র দায়িত্ব, MP-র দায়িত্ব, নাকি স্থানীয় পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের?
আপনি যদি নিশ্চিত না হন, তাহলে একটু ভেবে দেখুন। কারণ আপনার এই বিভ্রান্তি সম্ভবত আপনার আশপাশের আরও অনেক মানুষেরই রয়েছে।
সূত্র: ভারতের সংবিধান, সপ্তম তফসিল (কেন্দ্রীয়, রাজ্য ও যুগ্ম তালিকা); The Tribune, “Delhi Government Raises MLALAD Fund From Rs10 to Rs 15 Crore”; PRS Legislative Research, “Explained: How MPLAD Scheme Works”—রাজ্যগুলির MLALAD বরাদ্দের তুলনামূলক তথ্য।