
নয়াদিল্লি: বর্ষা এলেই রাস্তায় জল জমে যায়। বছরের পর বছর এই সমস্যা চলতে থাকায় এক বাসিন্দা ক্ষোভের সঙ্গে বলে উঠলেন, “আমাদের সাংসদ কী করছেন?” এমন প্রশ্ন করা একেবারেই স্বাভাবিক। তবে প্রশ্নটা হয়তো ভুল দফতরের দিকে ছোড়া হচ্ছে। একজন সাংসদ (Member of Parliament) আপনার এলাকার রাস্তা সারানোর জন্য নির্বাচিত হন না। সাধারণত সেই দায়িত্ব পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের। আগের দুই পর্বে আমরা যাঁদের নিয়ে আলোচনা করেছি। একজন সাংসদের আসল সাংবিধানিক দায়িত্ব তার চেয়ে এক ধাপ উপরে—একেবারে জাতীয় স্তরে।
ভারতের একজন সাংসদের প্রধান দায়িত্ব কী?
তাহলে একজন সাংসদ কী করেন? মূলত তাঁরা আইন তৈরি করেন। ভারতে কোনও বিল আইনে পরিণত হতে হলে তা সংসদের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সাংসদেরাই সেই বিল নিয়ে আলোচনা করেন, প্রশ্ন তোলেন এবং ভোট দেন। কয়েকদিন আগে আমরা দেখেছিলাম, একটি সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাব কীভাবে ‘না’-র তুলনায় বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েও ব্যর্থ হয়েছিল। সেই ভোটও সাংসদেরাই দিয়েছিলেন—এটাই তাঁদের কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাংসদেরা সরাসরি সরকারকেও প্রশ্ন করতে পারেন। সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তাঁরা মন্ত্রীদের নির্দিষ্ট ও কঠিন প্রশ্ন করতে পারেন। সেই প্রশ্ন এবং তার উত্তর সরকারি রেকর্ডে থাকে এবং দেশবাসী তা জানতে পারেন। এরপর রয়েছে জিরো আওয়ার। সাধারণত প্রশ্নোত্তর পর্বের পর এই পর্ব হয়। এই সময়ে সাংসদেরা এমন জরুরি স্থানীয় বা জাতীয় বিষয় তুলে ধরতে পারেন, যা সেদিনের নির্ধারিত তালিকায় ছিল না।
এখানেই একজন সাংসদ তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষের সমস্যাকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কোনও রাস্তার গর্ত নিজে গিয়ে সারিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং দিল্লিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে সেই সমস্যার কথা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে।
সাংসদের কাজের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত দিক রয়েছে। তাঁরা সংসদীয় কমিটিতে কাজ করেন। এই ছোট ছোট কমিটিগুলি কোনও বিল বা কোনও মন্ত্রকের বাজেট নিয়ে বিস্তারিতভাবে, অনেক সময় লাইন ধরে, পর্যালোচনা করে। সংসদে কোনও বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হওয়ার অনেক আগেই এই কমিটিগুলিতে তার খুঁটিনাটি নিয়ে কাজ হয়।
সরকারের কাজকর্মের যে গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি হয়, তার একটা বড় অংশই এই কমিটি কক্ষে। ক্যামেরার সামনে হওয়া বক্তৃতার মতো তা হয়তো সন্ধ্যার খবরের শিরোনাম হয় না, কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব যথেষ্ট।
MPLADS তহবিলের ৫ কোটি টাকায় কী কাজ হয়?
এরপর রয়েছে সাংসদের কাজের এমন একটি দিক, যা অনেকেই পুরোপুরি জানেন না। প্রতিটি সাংসদের জন্য বছরে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে MPLADS (Members of Parliament Local Area Development Scheme)-র মাধ্যমে। এই অর্থ স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত।
তবে এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—সাংসদ নিজে এই টাকা হাতে পান না। তিনি শুধু সুপারিশ করতে পারেন, কোথায় সেই টাকা খরচ করা হবে। যেমন কোথাও নতুন রাস্তা, কোথাও স্কুলের ভবন, আবার কোথাও পানীয় জলের প্রকল্প। প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের। অর্থাৎ কোনও স্থানীয় সমস্যা সমাধানে সাংসদ উদ্যোগ নিলেও তিনি নিজে সেই কাজ তৈরি বা বাস্তবায়ন করেন না। তিনি মূলত সুপারিশ করেন।
এই কারণেই একটি অদ্ভুত অথচ খুব পরিচিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। কোনও ভোটার দেখছেন, তাঁর এলাকার রাস্তায় এখনও জল জমছে। তিনি সাংসদকে দায়ী করছেন। অন্যদিকে সাংসদ মনে করতে পারেন, যে রাস্তা তৈরি বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাঁর ছিলই না, তার জন্য তাঁকে অন্যায়ভাবে দায়ী করা হচ্ছে।
দুই পক্ষের বক্তব্যই একই সঙ্গে সত্যি হতে পারে।
সংসদে আপনার সাংসদ কেমন কাজ করছেন, তা কীভাবে জানবেন?
তার মানে অবশ্য সাংসদের কোনও দায় নেই, এমন নয়। কেউ নিয়মিত সংসদে উপস্থিত থাকেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেন, সংসদীয় কমিটিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন এবং MPLADS-এর বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য সুপারিশ করেন। আবার কেউ তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকেন। এই পার্থক্য বাস্তব। আর তা যাচাই করাও সম্ভব।
PRS Legislative Research-এর মতো স্বাধীন সংস্থা সাংসদদের সংসদীয় কাজের বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করে। যেমন তাঁদের উপস্থিতি, তাঁরা কতগুলি প্রশ্ন করেছেন এবং কতগুলি বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে MPLADS-এর টাকা কোথায় খরচ হয়েছে এবং কোন কোন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেই তথ্য সরকারি MPLADS পোর্টালেও দেখা যায়। এর জন্য কোনও ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা ভিতরের খবরের প্রয়োজন নেই। তথ্যগুলি সর্বসাধারণের জন্যই প্রকাশ্যে রয়েছে। শুধু খোঁজার আগ্রহ থাকতে হবে।
তাই পরের বার বর্ষায় কোনও রাস্তা জলে ডুবে গেলে এবং ক্ষোভ গিয়ে ‘MP’-র উপর পড়লে, একটু থেমে দুটো আলাদা প্রশ্ন করা যেতে পারে। প্রথমত, সমস্যাটি কি সত্যিই আমার সাংসদের দায়িত্ব, নাকি পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের? দ্বিতীয়ত, যে দফতরের দায়িত্বই হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কি নিজের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে?
দুটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন। এবং দায়বদ্ধ করার মানুষও আলাদা। দুটিকে গুলিয়ে ফেললে শুধু ভুল জায়গায় দায় চাপানো হয় না, প্রকৃত দায়িত্বপ্রাপ্ত দফতরও নীরবে দায় এড়িয়ে যেতে পারে।
সূত্র: কেন্দ্রীয় সরকারের Ministry of Statistics and Programme Implementation-এর MPLADS নির্দেশিকা; PRS Legislative Research-এর MP Track; কেন্দ্রের MPLADS পোর্টাল।