
নয়াদিল্লি: একজন তরুণ স্নাতক কলেজের পড়াশোনা শেষ করেন হাতে একটি ডিগ্রি, সামান্য অভিজ্ঞতার পরিচয় দেওয়া একটি জীবনবৃত্তান্ত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা নিয়ে। কিছুদিন তিনি ভাড়ার বাইক নিয়ে খাবার ডেলিভারির কাজ করেন। কোনওরকমে সংসার চালানোর মতো আয় হয়। কিন্তু মনে মনে তিনি তখনও এমন একটি কাজের আশায় থাকেন, যা তাঁর পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পড়াশোনা শেষ করা এবং প্রকৃত অর্থে নিয়মিত, সুসংগঠিত কর্মজীবনে প্রবেশ করার মধ্যবর্তী এই সময়টা ভারতের তরুণ প্রজন্মের জীবনের এমন একটি অধ্যায়, যা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। অথচ প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান।
বিশ্বের অনেক দেশে এই ব্যবধানকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় না। বরং পরিকল্পিতভাবে এই সময়ের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। জার্মানিতে এর অন্যতম পরিচিত উদাহরণ হল ‘ডুয়াল’ শিক্ষানবিশি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় তরুণরা একদিকে শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করেন, অন্যদিকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজ শেখেন। প্রশিক্ষণের সময় তাঁরা নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকও পান। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮ কোটি ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার জার্মানিতে প্রায় ১৩ লক্ষ মানুষ শিক্ষানবিশ হিসেবে নথিভুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দেড় শতাংশ এই ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন।
কেন ভারতে শিক্ষানবিশির মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশের সেতু এত ছোট?
ভারতেও এই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। এর নাম ন্যাশনাল অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোমোশন স্কিম (NAPS)। কিন্তু পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৯ লক্ষ ৮৫ হাজার মানুষ শিক্ষানবিশ হিসেবে যুক্ত ছিলেন। অথচ ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও বেশি। অনুপাতের নিরিখে জার্মানির তুলনায় ভারতে শিক্ষানবিশের সংখ্যা প্রায় কুড়ি গুণ কম। যদিও ভারতের যুবসমাজের মোট সংখ্যা জার্মানির তুলনায় অনেক বেশি।
এখানে এমন একটি তথ্য রয়েছে, যা অধিকাংশ মানুষকেই অবাক করতে পারে। সমস্যাটা মূলত সুযোগের অভাব নয়। সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের নিজস্ব শিক্ষানবিশি প্রকল্পের আওতায় ৭০ লক্ষেরও বেশি পদ এখনও খালি পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ, সুযোগের অভাব নেই। বরং আগের তুলনায় অনেক কম তরুণ এই পদগুলিতে আবেদন করছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে শিক্ষানবিশির জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল ৪২.৮ লক্ষ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ লক্ষের কিছু বেশি। এই বিপুল পতন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কলেজের পড়াশোনা এবং কর্মজীবনের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার জন্যই যেখানে লক্ষ লক্ষ পদ রাখা হয়েছে, সেখানে তরুণদের একটা বড় অংশ সেই সুযোগ নিতে চাইছেন না কেন?
এর একটা উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সাধারণ অর্থনীতির হিসেবনিকেশের মধ্যে। শিক্ষানবিশির ক্ষেত্রে সাধারণত মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়। অনেক সময় এই কাজের জন্য অন্য শহরে যেতে হয়। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর স্থায়ী চাকরি মিলবে, এমন নিশ্চয়তাও থাকে না।
অন্যদিকে, গিগ অর্থনীতির কাজ—যেমন খাবার ডেলিভারি, ক্যাব চালানো কিংবা খুচরো বিপণিতে নির্দিষ্ট সময়ের শিফটে কাজ—তুলনায় দ্রুত আয় করার সুযোগ দেয়। এর জন্য অন্য শহরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। দীর্ঘমেয়াদি কোনও প্রতিশ্রুতিও দিতে হয় না।
যে তরুণ নিজের খরচ চালান কিংবা পরিবারের আয়ে সাহায্য করেন, তাঁর কাছে তাৎক্ষণিক আয়ের সুযোগটাই বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের ধীরগতির পথের বদলে অনিশ্চিত হলেও দ্রুত উপার্জনের গিগের কাজই প্রায়শই অগ্রাধিকার পায়।
দেশের সামগ্রিক ভবিষ্যতের কথা ভাবলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গিগের কাজ যে উপকারী নয়, তা কিন্তু একেবারেই নয়। এই ধরনের কাজ নমনীয়, দ্রুত আয়ের সুযোগ দেয় এবং বহু মানুষের কাছে বাস্তব উপার্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এই কাজের মাধ্যমে সাধারণত এমন নির্দিষ্ট ও স্বীকৃত দক্ষতা তৈরি হয় না, যা ভবিষ্যতে বেশি বেতনের এবং তুলনামূলকভাবে স্থায়ী কর্মজীবনের পথ খুলে দিতে পারে।
অন্যদিকে, সুসংগঠিত শিক্ষানবিশি ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই হল সেই সেতু তৈরি করা। শ্রেণিকক্ষে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দক্ষতায় পরিণত করা, যা অধিকাংশ অসংগঠিত কাজের মাধ্যমে সহজে সম্ভব হয় না।
ফলে ভারতের বিপুল সংখ্যক তরুণের ক্ষেত্রে কলেজ শেষ করা এবং প্রথম প্রকৃত চাকরিতে যোগ দেওয়ার মধ্যবর্তী সময়টা কোনও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে না। বরং তাঁরা এমন কাজ বেছে নিচ্ছেন, যেটা থেকে সবচেয়ে দ্রুত আয় শুরু করা যায়। কয়েক বছর পর সেই কাজ তাঁদের কোথায় নিয়ে যাবে, তা নিয়ে ভাবার সুযোগ বা অবকাশ অনেক সময় থাকছে না।
সুসংগঠিত প্রশিক্ষণের পথকে কীভাবে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়?
এর অর্থ এই নয় যে তরুণরা ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বরং তাঁদের সামনে বাস্তবে যে সুযোগগুলি রয়েছে, নিজের শহরে যে পরিস্থিতির মধ্যে তাঁরা রয়েছেন এবং জীবনের যে পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছেন, সেই অনুযায়ী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা যুক্তিসংগত সিদ্ধান্তই নিচ্ছেন।
আসল প্রশ্ন হল, সুসংগঠিত প্রশিক্ষণ ও কর্মজীবনে প্রবেশের পথটি কেন এখনও বিকল্প ব্যবস্থার তুলনায় এত কম আকর্ষণীয়? বিশেষ করে যখন লক্ষ লক্ষ আনুষ্ঠানিক পদ খালি পড়ে রয়েছে এবং সেই পদগুলির জন্য প্রয়োজন ঠিক সেই তরুণদেরই, যাঁরা অন্য পথ বেছে নিচ্ছেন।
পরের বার যখন কোনও তরুণ স্নাতককে গিগের কাজ করতে দেখবেন, যিনি নিজের ভবিষ্যতের পথ খুঁজছেন, তখন তাঁকে ‘এর পর কী করবেন?’—এই প্রশ্নটি করার বদলে আরও সহজ ও কার্যকর একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে।
বরং জানতে চাওয়া যেতে পারে, তাঁর মতো পরিস্থিতিতে থাকা একজন তরুণের কাছে সুসংগঠিত প্রশিক্ষণ ও কর্মজীবনে প্রবেশের পথটিকে সত্যিই আকর্ষণীয় করে তুলতে কী কী প্রয়োজন ছিল?
সূত্র: ন্যাশনাল অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোমোশন স্কিম, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোগ মন্ত্রক—২০২২ থেকে ২০২৫ সালের আবেদন ও শিক্ষানবিশ নিয়োগের তথ্য; নীতি আয়োগ—শিক্ষানবিশি প্রকল্পের ঘাটতি সংক্রান্ত পর্যালোচনা; জার্মানির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (BIBB)—শিক্ষানবিশি সংক্রান্ত পরিসংখ্যান।