
নয়াদিল্লি: এক সকালে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন এক মা। বাড়ির সামনের ফুটপাথের অর্ধেক দখল করে দাঁড়িয়ে একটি গাড়ি, বাকি অর্ধেক জুড়ে ফল বিক্রেতার ঠেলা। বাধ্য হয়ে সন্তানকে আরও শক্ত করে হাত ধরে রাস্তায় নেমে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি।
ভারতের অসংখ্য রাস্তায় প্রতিদিন এমন ঘটনা ঘটে। অথচ খুব কম মানুষই থেমে একটি সহজ প্রশ্ন করেন—ফুটপাথটি আসলে কার? আইনের উত্তর কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে স্পষ্ট। যদিও বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
পাবলিক ফুটপাথ ব্যবহারের অধিকার কার?
১৯৮৫ সালে Olga Tellis বনাম Bombay Municipal Corporation মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত জীবনধারণের অধিকারের মধ্যে জীবিকা নির্বাহের অধিকারও রয়েছে। কারণ, উপার্জনের কোনও উপায় ছাড়া একজন মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
মামলাটির কেন্দ্রে ছিলেন ফুটপাথে বসবাসকারী মানুষজন, যাঁদের উচ্ছেদের মুখে পড়তে হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া যায় না। তবে একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছিল, এই অধিকার নিরঙ্কুশ নয়। ফুটপাথ একটি জনসাধারণের জায়গা, যার উদ্দেশ্য জনস্বার্থে ব্যবহার করা। ফলে সেখানে যে কোনও ধরনের ব্যবহারকেই সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
এর পরে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় সুপ্রিম কোর্ট। ২০২৬ সালের একটি রায়ে আদালত জানায়, নিরাপদ এবং স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ফুটপাথে হাঁটাও একটি মৌলিক অধিকার। সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবনধারণের অধিকার—দুইয়েরই সঙ্গে এই অধিকার যুক্ত।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার একটি জাতীয় কর্মসূচির প্রস্তাব দেয়, যা ‘ভারত জনপথ যোজনা’ নামে পরিচিত। এর লক্ষ্য ১০০টি ভারতীয় শহরে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার সংযুক্ত ও হাঁটার উপযোগী ফুটপাথ তৈরি করা। অর্থাৎ একদিকে সংবিধান নাগরিকের নিরাপদে হাঁটার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। অন্যদিকে জীবিকা নির্বাহের অধিকারও সুরক্ষিত। ২০১৪ সালের Street Vendors Act-এ নিবন্ধিত হকারদের নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবসা করার আইনি অধিকার দেওয়া হয়েছে। কোন এলাকা হকারদের জন্য নির্ধারিত হবে, তা ঠিক করে স্থানীয় কমিটি। সেই কমিটিতেও হকারদের প্রতিনিধিত্ব থাকে।
অর্থাৎ দু’পক্ষের অধিকারই বাস্তব এবং বৈধ। এক পক্ষকে সরাসরি ভুল বলে দেওয়ার সুযোগ নেই।
কেন একই জায়গার জন্য লড়াই পথচারী, হকার ও গাড়ির?
ভারতের অধিকাংশ শহরের আসল সমস্যা ফুটপাথে দাবিদারের সংখ্যা বেশি হওয়া নয়। সমস্যা হল, ফুটপাথের কোন অংশ শুধু হাঁটার জন্য, কোন অংশ হকারদের জন্য এবং কোথায়, যদি আদৌ থাকে, গাড়ি পার্ক করা যাবে—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
এই সিদ্ধান্ত যদি দৃশ্যমানভাবে নেওয়া না হয় এবং নিয়মিতভাবে তা কার্যকর না করা হয়, তা হলে শেষ পর্যন্ত একই তিন ফুট জায়গার জন্য সবাই অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতা করতে শুরু করেন।
আর সবচেয়ে আগে হারেন পথচারী। কারণ তাঁর গাড়ির হর্ন নেই, তর্ক করার ক্ষমতা নেই, কোনও লাইসেন্সও নেই যা দেখিয়ে নিজের জায়গা দাবি করতে পারেন। একবার ভাবুন, এর প্রভাব একজন বয়স্ক মানুষ, দৃষ্টিহীন ব্যক্তি কিংবা ছোট শিশুকে নিয়ে হাঁটা কোনও অভিভাবকের ক্ষেত্রে কী হতে পারে।
অধিকাংশ মানুষের কাছে কোনও বাধা এড়াতে রাস্তায় নেমে যাওয়া নিছক বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা। কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে সেটি সত্যিই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে আরও একটি নীরব পরিহাস রয়েছে। ভারত দ্রুত গতিতে হাইওয়ে, উড়ালপুল এবং এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করছে। বছরে নির্মিত সড়কের দৈর্ঘ্যের বিচারে দেশের সড়ক নির্মাণের গতি বিশ্বের অন্যতম দ্রুত। অথচ সাধারণ একটি ফুটপাথ—যা প্রায় প্রতিটি ভারতীয়ই প্রতিদিনের জীবনে কোনও না কোনও সময় ব্যবহার করেন—দেশের সবচেয়ে অবহেলিত এবং বিতর্কিত জনপরিকাঠামোগুলির অন্যতম হয়ে রয়েছে।
তবে কয়েকটি শহর ফুটপাথকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু করেছে। কোথায় পথচারীদের হাঁটার মতো জায়গা রয়েছে, তা মানচিত্রে চিহ্নিত করা হচ্ছে। নির্দিষ্টভাবে হকারদের জন্য জায়গা বরাদ্দ করা হচ্ছে। হাঁটার জায়গা থেকে গাড়ি পার্কিং সরিয়ে রাখা হচ্ছে।
যেখানে এই ব্যবস্থা সঠিকভাবে কার্যকর হয়েছে, সেখানে পথচারী এবং হকার—দু’পক্ষই লাভবান হয়েছেন। কারণ, স্পষ্ট নিয়ম সাধারণত সংঘাত বাড়ায় না, বরং কমায়।
সবার জন্য ফুটপাথের নিয়ম কে ঠিক করবে?
পুরো বিষয়টি কোনও হকার, যিনি জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন, তাঁকে দোষারোপ করার নয়। আবার গাড়ি রাখার জায়গা খুঁজছেন এমন কোনও চালককেও একতরফাভাবে দোষ দেওয়া যায় না। আসল সমস্যা হল, যে জনপরিসর আইন অনুযায়ী সকলের জন্য, বাস্তবে সেটিই প্রায়শই তাঁর দখলে চলে যায়, যিনি প্রতিদিন সকালে সবার আগে সেটি দখল করে নেন।
পরের বার যখন কোনও ব্যস্ত রাস্তায় ফুটপাথ ছেড়ে আপনাকে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হবে, তখন হয়তো অন্য একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে। আপনার পথে কে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, শুধু সেই প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন করুন—আপনার শহরে ফুটপাথটি যাঁদের জন্য তৈরি, তাঁদের সবার জন্য সেটি কার্যকর করতে এখনও কেন একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানা হয়নি?
সূত্র: Olga Tellis & Ors. v. Bombay Municipal Corporation, সুপ্রিম কোর্ট, ১৯৮৫; সুপ্রিম কোর্টের ২০২৬ সালের রায়, যেখানে ১৯(১)(ডি) এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে পথচারীদের নিরাপত্তাকে মৌলিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; Street Vendors (Protection of Livelihood and Regulation of Street Vending) Act, 2014; Institute for Transportation and Development Policy-এর ভারতের ‘Right to Walk’ সংস্কার সংক্রান্ত প্রতিবেদন।