
নয়াদিল্লি: ভারতের বেশিরভাগ গ্রামে দায়িত্বে থাকা প্রধান ব্যক্তিকে বলা হয় গ্রামপ্রধান বা সরপঞ্চ। গ্রামের মানুষ ভোট দিয়ে তাঁকে নির্বাচিত করেন। তিনি স্থানীয় পঞ্চায়েতের প্রধান। এক অর্থে গ্রামের মেয়রের সবচেয়ে কাছাকাছি পদ। গ্রামপ্রধান বা সরপঞ্চের নিচে, অধিকাংশ রাজ্যেই থাকেন পঞ্চায়েত সচিব। তিনি সাধারণত সরকারের নিয়োগ করা আধিকারিক। পঞ্চায়েতের নথিপত্র, রেকর্ড এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজকর্মের বড় অংশ তাঁর দায়িত্বে থাকে। শহরের ক্ষেত্রে মেয়র ও পুর কমিশনারের মধ্যে যে ব্যবধান, গ্রামের ক্ষেত্রেও অনেকটা তেমনই সরপঞ্চ ও পঞ্চায়েত সচিবের ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
এখানে একটি সংখ্যা মনে রাখা জরুরি। ভারতে ১৫ লক্ষেরও বেশি নির্বাচিত গ্রামস্তরের জনপ্রতিনিধি মহিলা। বিহারের মতো কিছু রাজ্যে পঞ্চায়েতের অর্ধেকেরও বেশি আসন মহিলাদের দখলে। একই সময়ে, এই বিপুল সংখ্যক নির্বাচিত মহিলা জনপ্রতিনিধির উপস্থিতির নজির বিশ্বের আর কোথাও নেই।
৭৩তম সংবিধান সংশোধনীতে গ্রামের জন্য কী বদলেছিল?
এটা অবশ্য হঠাৎ করে হয়নি। ১৯৯২ সালে সংবিধানে ৭৩তম সংশোধনী আনা হয়। এর মাধ্যমে গ্রামীণ ভারতের জন্য দুটি বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। প্রথমত, প্রতিটি গ্রামে পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচিত একটি স্থানীয় সরকার থাকবে। যাকে বলা হবে পঞ্চায়েত। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রতিটি পঞ্চায়েতে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। পরে অনেক রাজ্য এই সংরক্ষণের হার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেছে।
৭৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে তৈরি হয় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা—গ্রামসভা। এটি কোনও ছোট নির্বাচিত পরিষদ নয়। বরং গ্রামের ভোটার তালিকায় নাম থাকা প্রতিটি ভোটারই গ্রামসভার সদস্য। পঞ্চায়েত কী কাজ করবে, কীভাবে পরিকল্পনা করবে—সেই বিষয়ে আলোচনা ও অনুমোদনের সুযোগ রয়েছে গ্রামসভায়।
তত্ত্বের বিচারে এটি সরাসরি গণতন্ত্রের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি ব্যবস্থা। শুধু পাঁচ বছর অন্তর ভোট দিয়ে ‘কে কী করবেন’ তার অপেক্ষায় থাকা নয়। বরং গ্রামের মানুষ এক জায়গায় বসে নিজেদের গ্রামের বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে সরাসরি আলোচনা করবেন—এটাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
কাগজে-কলমে প্রতিশ্রুতিটা এমনই। কিন্তু বাস্তব চিত্র, যথারীতি, কিছুটা জটিল।
পঞ্চায়েতের টাকা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে সমস্যা কোথায়?
১৯৯২ সালের ওই সংশোধনীতে পঞ্চায়েতের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল ২৯টি বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে পানীয় জল, রাস্তা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা, কৃষিতে সহায়তা, স্থানীয় স্কুল-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু কয়েক দশক পরও অধিকাংশ রাজ্যে এই ২৯টি বিষয়ের সবগুলির উপর পঞ্চায়েতকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়নি।
পঞ্চায়েতগুলিকে প্রায়ই রাজ্য সরকারের কাছ থেকে অর্থ বরাদ্দের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অর্থাৎ, নিজেদের হাতে নিয়মিত ও নিশ্চিত তহবিল থাকার বদলে অনেক ক্ষেত্রেই রাজ্য সরকার কখন টাকা দেবে, কত টাকা দেবে—তার উপর নির্ভর করতে হয় পঞ্চায়েতকে।
ফলে গ্রামপ্রধান গ্রামের পুরনো কুয়োটি মেরামত করতে চাইলেও, বহু কিলোমিটার দূরের কোনও সরকারি দফতর থেকে টাকা আসার অপেক্ষায় তা আটকে থাকতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কিছু গ্রামে সংরক্ষিত আসনে কোনও মহিলা গ্রামপ্রধান বা সরপঞ্চ নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর স্বামী বা পরিবারের কোনও পুরুষ সদস্য কার্যত তাঁর হয়ে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন। গবেষক ও সমাজকর্মীরা এই প্রবণতাকে একটি বিশেষ নামও দিয়েছেন—‘সরপঞ্চ পতি’। অর্থাৎ, গ্রামপ্রধানের স্বামী। অবশ্য এমনটা সর্বত্র হয় না। বহু নির্বাচিত মহিলা নিজেরাই দৃঢ়ভাবে পঞ্চায়েত পরিচালনা করেন এবং সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন।
তবুও এই প্রবণতা এতটাই দেখা যায় যে, ভারতের স্থানীয় প্রশাসনে এটি একটি স্বীকৃত সমস্যা হয়ে উঠেছে। কারণ, সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হওয়া এবং বাস্তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারা—দুটি বিষয় সবসময় এক নয়।
গ্রামসভা কী এবং কীভাবে গ্রামবাসীরা অংশ নিতে পারেন?
তাহলে আসলে আপনার গ্রামের রাশ কার হাতে? কাগজে-কলমে উত্তরটা সহজ। আপনার ভোটে নির্বাচিত গ্রামপ্রধান এবং গ্রামসভা—যার সদস্য আপনি এবং গ্রামের প্রতিটি ভোটার। বাস্তবে অবশ্য বিষয়টি নির্ভর করে অনেক কিছুর উপর।
নির্ভর করে, এ বছর রাজ্য সরকার পঞ্চায়েতকে কত টাকা দিয়েছে। নির্ভর করে, নির্বাচিত ব্যক্তি সত্যিই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কি না। আর নির্ভর করে, গ্রামসভা যখন বসছে তখন কতজন গ্রামবাসী সেখানে উপস্থিত হচ্ছেন। কারণ, সভাকক্ষ যদি খালি থাকে, তাহলে কাউকে জবাবদিহি করানোর মতো মানুষও সেখানে থাকবেন না। আর এই শেষ বিষয়টি এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রত্যেক গ্রামবাসীর সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।
গ্রামসভায় যোগ দেওয়ার জন্য আপনার কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই। আপনি সেখানে কোনও অতিথি নন। ভোট দেওয়ার বয়সে পৌঁছে গ্রামের ভোটার তালিকায় আপনার নাম থাকলেই আপনি গ্রামসভার একজন সদস্য।
অনেক গ্রামেই গ্রামসভার বৈঠকে উপস্থিতির হার কম। আর তার ফলে অনেক সময় গ্রামবাসীরা নীরবে নিজেদের গ্রামের প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ তাঁদের হাতেই তুলে দেন, যারা সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকেন। তাই প্রশ্নটা আপনার কাছেই—আপনার গ্রামসভা কি সম্প্রতি বসেছে? আর বসে থাকলে, আপনি কি সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন?
সূত্র: Scroll.in-র “In Five Charts, Women’s Representation Across Various Levels of Governance” (২০২৬); কেন্দ্রীয় সরকারের পঞ্চায়েতিরাজ মন্ত্রক, Lok Sabha Unstarred Question No. 870 (২০১৫ সালের ২৪ জুলাই); Constitution of India, Part IX and the Eleventh Schedule (73rd Amendment Act, 1992); Drishti IAS, “Mahila Sabhas on International Women’s Day।