
নয়াদিল্লি: ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় শুধু একটি দেশ স্বাধীন হয়নি। একইসঙ্গে যেন শত শত ছোট ছোট দেশও স্বাধীনতার আলো দেখেছিল। তখন ভারতে ছিল ৫৬৫টি প্রিন্সলি স্টেটস। প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব রাজা বা রানি, নিজস্ব নিয়মকানুন, নিজস্ব মুদ্রা এবং নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল। এই রাজ্যগুলি সম্মিলিতভাবে ভারতের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ড জুড়ে ছিল। সরকারিভাবে এগুলির কোনওটিই ব্রিটিশ শাসিত ভারতের অংশ ছিল না। নিজেদের মতো করে তারা ছিল আলাদা—পাশাপাশি থাকা ৫৬৫টি ছোট দেশের মতো।
কীভাবে ৫৬৫টি প্রিন্সলি স্টেটস ভারতের অংশ হল?
পরবর্তী দু’বছর ধরে সর্দার বল্লভভাই পটেল, তাঁর সহযোগী আধিকারিক ভি.পি. মেননকে সঙ্গে নিয়ে এই রাজ্যগুলিকে ভারতের অংশ করে তোলার কাজ শুরু করেন। কাজটি মোটেই সহজ ছিল না। একে একে প্রতিটি রাজাকে বোঝাতে হয়েছিল। কোথাও ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা, আবার কোথাও ছিল কঠোর চাপ। কোনও কোনও রাজা কয়েক দিনের মধ্যেই রাজি হয়ে যান।
ত্রাভাঙ্কোর নামে একটি রাজ্য প্রথমে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। পরে সিদ্ধান্ত বদলে ভারতের সঙ্গে যোগ দেয়। আবার জুনাগড় পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। যদিও সেখানকার অধিকাংশ মানুষ ছিলেন হিন্দু। পরে সেই সিদ্ধান্তও বদলে যায়।
আর হায়দরাবাদ, তৎকালীন ভারতের অন্যতম ধনী এবং জেদি রাজ্য, দীর্ঘদিন ভারতের সঙ্গে যুক্ত হতে অস্বীকার করে। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৮ সালে ভারতীয় সেনাকে সেখানে হস্তক্ষেপ করতে হয়। ১৯৫০ সালের মধ্যে প্রায় সমস্ত দেশীয় রাজ্যই ভারতের অংশ হয়ে যায়।
কিন্তু এখানেই রয়েছে এমন একটি বিষয়, যার প্রভাব আজও রয়েছে।
ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ার অর্থ এই ছিল না যে প্রতিটি রাজ্য তার আগের ইতিহাস মুছে ফেলেছিল। স্বাধীনতার আগে কোনও রাজ্য তার মানুষের জন্য কী করেছিল, আর কী করেনি—সেই উত্তরাধিকার থেকেই গিয়েছিল।
কেন কিছু রাজ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে এগিয়ে ছিল?
উদাহরণ হিসেবে কেরলকে ধরা যায়। স্বাধীনতার অনেক আগে, কেরল হওয়ার আগে যে রাজ্যটির নাম ছিল ত্রাভাঙ্কোর, সেখানে সাধারণ মানুষের জন্য স্কুল ও হাসপাতাল তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল দেশের অনেক জায়গার তুলনায় আগে এবং বেশি গুরুত্ব দিয়ে। সেখানকার শাসকরা স্বাধীনতার অনেক আগেই শিক্ষার গুরুত্ব বুঝেছিলেন। এমনকি ভারতের অন্যান্য বহু জায়গায় মেয়েদের স্কুলে যাওয়া যখন সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠেনি, তখনও ত্রাভাঙ্কোরে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
ত্রাভাঙ্কোর ভারতের অংশ হয়ে যাওয়ার পর সেই পুরনো অভ্যাস হারিয়ে যায়নি। বরং সেটাই কেরলের জন্য একটি ঐতিহাসিক এগিয়ে থাকার সুবিধা তৈরি করে দেয়।
অন্য দেশীয় রাজ্যগুলি একই কাজ করেনি। কোনও রাজা অন্য বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কোনও রাজ্যের হাতে সম্পদ কম ছিল, ফলে সেখানে স্কুলও তৈরি হয়েছে কম। আর যে অঞ্চলগুলি কোনও ভারতীয় রাজার অধীনে না থেকে সরাসরি ব্রিটিশদের শাসনে ছিল, সেখানকার পরিস্থিতিও অনেক ক্ষেত্রে আলাদা ছিল। ব্রিটিশদের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজস্ব আদায় এবং পণ্য বন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া; স্থানীয় শিশুদের জন্য স্কুল তৈরি করা নয়।
ফলে ১৯৫০ সালে যখন এই সমস্ত অঞ্চল একসঙ্গে ‘ভারত’ হয়ে উঠল, তখন তারা একই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করেনি। কেউ তখনই কিছুটা এগিয়ে ছিল। কেউ ছিল অনেক পিছিয়ে।
আর সেই ব্যবধান তৈরি হয়েছিল এমন কিছু সিদ্ধান্তের কারণে, যা বহু বছর আগে শাসকরা নিয়েছিলেন। আজকের মানুষ সেই সিদ্ধান্তগুলির জন্য দায়ীও নয়, তাঁদের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও সুযোগও ছিল না।
আজও কেন ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে এত পার্থক্য?
এই ইতিহাসের প্রভাব আজও ভারতের উপর রয়েছে। কেরলের মতো যে রাজ্যগুলি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থেকেই যাত্রা শুরু করেছিল, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই সুবিধা ধরে রাখতে পেরেছে। অন্যদিকে, যেসব রাজ্য পিছিয়ে থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, তারা কয়েক দশক ধরে সেই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে। সংবিধান তৈরি হওয়ার আগেই যে পিছিয়ে পড়ার ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব তাদের সঙ্গে থেকেছে।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে আজকের রাজ্যগুলির মধ্যে থাকা সমস্ত পার্থক্যের জন্য শুধু ইতিহাস দায়ী।
১৯৫০ সালের পর প্রতিটি রাজ্য সরকার নিজেদের মতো করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিছু সিদ্ধান্ত ভালো হয়েছে, কিছু হয়নি। সেই সিদ্ধান্তগুলিরও বর্তমান পরিস্থিতির উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। তবে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি—ভারতের কোনও দুটি রাজ্য একই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করেনি।
তাই পরের বার যখন একটি ভারতীয় রাজ্যের সঙ্গে অন্য একটি রাজ্যের তুলনা করবেন, তখন হয়তো আরও একটি প্রশ্ন করা যায়।
শুধু এটা নয়—এই রাজ্য কতটা এগিয়েছে?
বরং এটাও—
এই রাজ্যের গল্পটা আসলে কতটা পিছন থেকে শুরু হয়েছিল?
সূত্র: ভি.পি. মেনন, The Story of the Integration of the Indian States (1956); Sardar Vallabhbhai Patel National Memorial-র “Integration: His Greatest Legacy”; ত্রাভাঙ্কোরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগ নিয়ে ঐতিহাসিক গবেষণা।