
সন্ধ্যেবেলা টেলিভিশন খুললে অনেক সময় আমরা দেখি যে এক মিনিটের মধ্যেই একটি বিল পাশ হয়ে গেল। বিলের নাম ঘোষণা হল, ভোটাভুটি হল, স্পিকার জানিয়ে দিলেন বিলটি পাশ হয়েছে। তারপরই চ্যানেলে চলে গেল পরের খবর।
দেখে মনে হয়, পুরো প্রক্রিয়াটি যেন মুহূর্তের ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। টেলিভিশনের সেই ১০ সেকেন্ডের ক্লিপের আগে একটি বিল সাধারণত বহুবার পড়া, আলোচনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সংশোধনের মধ্য দিয়ে যায়। সেই অংশটি আমরা বেশিরভাগ সময় দেখতে পাই না। আমরা শুধু শেষ মুহূর্তটি দেখি।
তাহলে প্রশ্ন হল, একটি বিল আইনে পরিণত হওয়ার আগে কেন তিনবার পড়া হয়?
সংসদে একটি বিলের প্রতিটি পাঠের নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। প্রথম পাঠে কোনও মন্ত্রী বা সাংসদ বিলটি সংসদে পেশ করার অনুমতি চান। এই পর্যায়ে বিল নিয়ে বিস্তারিত বিতর্ক হয় না। এরপর বিলটি ছাপা হয় এবং সাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ, নীতিগতভাবে যে কেউ বিলটি পড়ে দেখতে পারেন।
এরপর আসে দ্বিতীয় পাঠ। এই পর্যায়েই বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিলের প্রতিটি ধারা ধরে আলোচনা করা যেতে পারে। এমনকী কোনও একটি বাক্য, সংখ্যা বা একটি শব্দ পরিবর্তনের প্রস্তাবও দিতে পারেন সাংসদরা।
এই পর্যায়ের আগে একটি বিলকে সংসদীয় কমিটির কাছেও পাঠানো হতে পারে। কমিটি হল সাংসদদের একটি ছোট দল, যারা বিলটি আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করে। কখনও এই প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে। প্রয়োজন হলে বাইরের বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের মতামতও নেওয়া হতে পারে।
তৃতীয় পাঠে বিলটি নিয়ে মূল বিতর্ক প্রায় শেষ হয়ে যায়। এই পর্যায়েই বিলটির চূড়ান্ত রূপের উপর ভোটাভুটি হয়।তবে এখানেই একটি বিলের যাত্রা শেষ হয় না।
শুধু এক কক্ষে পাশ হলেই আইন নয়
ভারতের সংসদে দুটি কক্ষ রয়েছে—লোকসভা এবং রাজ্যসভা। অর্থ বিল ছাড়া সাধারণত সমস্ত বিল-কেই দুই কক্ষে পাশ হতে হয়। অর্থ বিলের ক্ষেত্রে আলাদা এবং তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত নিয়ম রয়েছে।
সাধারণ বিলকে প্রথমে একটি কক্ষে তিনটি পাঠের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এরপর অন্য কক্ষেও একইভাবে তিনটি পাঠ হয়। দুই কক্ষেই পাশ হওয়ার পর বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পরই একটি বিল আইন (Act) হিসেবে কার্যকর হয়। অর্থাৎ, গোটা প্রক্রিয়াটি দাঁড়ায়—তিনটি পাঠ, দুটি কক্ষ এবং শেষে রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে।
প্রক্রিয়াটি ইচ্ছাকৃতভাবেই ধীর রাখা হয়েছে। কারণ একটি আইন তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনে।
ধরা যাক, এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হবে যার পরে আর সহজে ফিরে আসার সুযোগ নেই। যেমন বড় অঙ্কের ঋণে সই করা, জীবনের বড় কোনও পরিবর্তনে সম্মতি দেওয়া বা এমন একটি ই-মেল পাঠানো যা পরে আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। সাধারণত আমরা কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একবার পড়ে তার বক্তব্য বুঝি এবং আবার পড়ে তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করি।
একশো কোটিরও বেশি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি আইন তৈরির ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন—এটাই এই ব্যবস্থার মূল ভাবনা।
বাস্তবে সব বিল একই মাত্রার বিস্তারিত পর্যালোচনার মধ্যে দিয়ে যায় না। PRS Legislative Research-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৪তম ও ১৫তম লোকসভার যথাক্রমে ৬০ শতাংশ এবং ৭১ শতাংশ বিল বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু ১৬তম লোকসভায় সেই হার কমে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশে। ১৭তম লোকসভার কয়েকটি অধিবেশনে আবার এমনও হয়েছে যে একাধিক বিল পাশ হলেও, একটিও বিল কমিটিতে বিস্তারিত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়নি।
অর্থাৎ, সংসদে বিল তৈরির যে কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছে, সেখানে ধীরে ধীরে পরীক্ষা ও পর্যালোচনার সুযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিস্তারিত অংশটি আগের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষেত্রে বাদ পড়েছে।
এটি কোনও একটি দল বা সরকারের বিষয় নয়। ক্ষমতায় থাকা প্রতিটি দলই কোনও না কোনও সময়ে নিজেদের বিল দ্রুত পাশ করাতে চেয়েছে। আবার বিরোধী দলগুলি বিভিন্ন সময়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার দাবি জানিয়েছে।সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ যেমন থাকে, তেমনই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে ঝুঁকিও থাকে।
সংসদে কোনও বিল দ্রুত পাশ হয়ে গেলেও, সেটি সম্পূর্ণ বৈধ আইন হতে পারে। সেই আইনও অন্য আইনের মতোই নাগরিকদের উপর প্রযোজ্য হবে এবং পুলিশ ও আদালতের মাধ্যমে তা কার্যকর করা যেতে পারে।
কাগজে লেখা আইনটি মনে রাখে না, সেটি তৈরি করতে কতটা সময় বা পরিশ্রম লেগেছিল। কিন্তু সেই আইনের অধীনে যাঁদের জীবন চলবে, তাঁদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
একটি আইন শুধু সংসদে পাশ হওয়ার দিনেই শেষ হয়ে যায় না। আসল পরীক্ষা শুরু হয় যখন সাধারণ মানুষকে সেই আইন মেনে চলতে হয়। কোনও অস্পষ্ট ধারা, আগে ভালোভাবে পরীক্ষা না করা কোনও প্রভাব বা এমন কোনও শব্দ, যা কমিটিতে নিয়ে আলোচনা হয়নি—এসব সমস্যা পরে সামনে আসতে পারে। তখন তার প্রভাব দেখা দিতে পারে আদালতের মামলায়, থানায় বা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দ্রুত পাশ হওয়া প্রতিটি আইন খারাপ, কিংবা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হওয়া প্রতিটি আইন ভালো। দ্রুততা নিজে সমস্যা নয়; অসতর্কতা সমস্যার কারণ হতে পারে।
তাই পরের বার টেলিভিশনে মাত্র ১০ সেকেন্ডের কোনও বিল পাশ হওয়ার খবর দেখলে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—বিলটি কি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে পড়া ও পর্যালোচনা করা হয়েছিল, নাকি শুধু দ্রুত পাশ করার মতো করেই প্রক্রিয়াটি শেষ করা হল?
সূত্র: PRS Legislative Research—In a Rush to Pass Bills, 17th Lok Sabha Is Not Scrutinising Future Laws Enough; PRS Legislative Research—How Is a Law Enacted in Parliament?; LawBhoomi—How Does a Bill Become a Law in India; Constitution of India, Articles 107–111.