
নাতি পঞ্চম শ্রেণির রিপোর্ট কার্ড নিয়ে বাড়ি ফিরতেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন ঠাকুমা। রিপোর্ট কার্ডে সব বিষয়েই পাশ নম্বর পেয়েছে নাতি। ঠাকুমার ধারণা, পাঁচ বছর স্কুলে পড়ার পর একটি শিশু নিশ্চয়ই সাবলীলভাবে পড়তে পারে এবং সাধারণ অঙ্কও করতে পারে। কিন্তু ভারতে অসংখ্য পরিবারের এই ধারণা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। বরং অধিকাংশ পরিবার যতটা মনে করে, তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষেত্রে এই ধারণা ভুল। গত দু’দশক ধরে শিক্ষা গবেষকরা যে সমস্যাটি নিয়ে নজরদারি করছেন, তার নাম ‘লার্নিং পভার্টি’ বা শিক্ষার প্রাথমিক দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি।
অ্যানুয়াল স্টেটাস অব এডুকেশন রিপোর্ট (ASER) হল ভারতের বৃহত্তম গ্রামীণ পরিবারভিত্তিক সমীক্ষা। এই সমীক্ষায় শুধু শিশুরা কোন শ্রেণিতে পড়ে, তা দেখা হয় না। বরং বাস্তবে তারা কী কী করতে পারে, সেটাই যাচাই করা হয়। সর্বশেষ সমীক্ষার ফলাফল যথেষ্ট উদ্বেগজনক। দেখা গিয়েছে, পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৭০ শতাংশ পড়ুয়া নিজেদের শ্রেণির উপযোগী সাধারণ অঙ্কের হিসাব করতে পারে না। তৃতীয় শ্রেণির ৭৬.৬ শতাংশ পড়ুয়া দ্বিতীয় শ্রেণির স্তরের একটি লেখা সাবলীলভাবে পড়তে পারে না। অথচ এই দক্ষতা দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যেই অর্জন করার কথা। তৃতীয় শ্রেণির প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে দু’জনই সাধারণ বিয়োগ করতে পারে না।
শ্রেণিতে পাশ করলেই কেন প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত হয় না?
এটা শিশুদের অলসতা কিংবা বুদ্ধির অভাবের গল্প নয়। বরং এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার ছবি, যেখানে বছরের পর বছর ধরে বয়স এবং শিক্ষাবর্ষের নিরিখে পড়ুয়াদের পরবর্তী শ্রেণিতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই পথে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক দক্ষতা তারা কতটা অর্জন করতে পেরেছে, তা সবসময় যাচাই করা হয়নি।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে যে শিশু সাবলীলভাবে পড়তে শেখেনি, সে সাধারণত তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে যায়। তারপর চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণিতেও পৌঁছে যায়। অথচ প্রতিটি পরবর্তী শ্রেণির পাঠ্যক্রম এমন কিছু দক্ষতার উপর নির্ভর করে তৈরি, যার ভিতই হয়তো তার তৈরি হয়নি। শেষ পর্যন্ত যখন বিষয়টি কারও নজরে আসে, তত দিনে কয়েক মাস নয়, বছরের পর বছর ধরে সেই ঘাটতি জমতে থাকে।
তবে একই সমীক্ষার তথ্যের মধ্যেই আশার কিছু ইঙ্গিতও রয়েছে। ২০২২ সালের সঙ্গে সর্বশেষ সমীক্ষার তুলনা করলে দেখা যায়, সরকারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির যে পড়ুয়ারা দ্বিতীয় শ্রেণির স্তরের লেখা পড়তে পারে, তাদের হার ১৬.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩.৪ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র দু’বছরের কিছু বেশি সময়ে ৭ শতাংশেরও বেশি উন্নতি হয়েছে। এর পিছনে রয়েছে অতিমারির পর বিভিন্ন রাজ্যে ধারাবাহিকভাবে নেওয়া শিক্ষার পুনরুদ্ধারমূলক উদ্যোগ।
গুজরাট, উত্তর প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যে এই উন্নতির হার ১০ শতাংশ বা তার বেশি। অন্যদিকে হিমাচল প্রদেশ ও বিহারে একই সময়ে উন্নতির হার মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ। অর্থাৎ শিক্ষার ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দেশের সর্বত্র সেই অগ্রগতির গতি এক নয়।
একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার ঘাটতি ঠিক কেমন দেখতে?
একটি নির্দিষ্ট শিশুর কথা ভাবুন। গ্রামের একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে একটি ছেলে। তার বাবা-মা কেউই নিজেরা স্কুলের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। তাঁদের বিশ্বাস, নিয়মিত স্কুলে যাওয়া এবং প্রতি বছর পরীক্ষায় পাশ করাই প্রমাণ করে যে সন্তান প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করছে। ছেলেটি মেধাবী, মনোযোগী এবং ভদ্র। ৪০ জন পড়ুয়ার একটি শ্রেণিকক্ষে, যেখানে প্রত্যেককে আলাদা করে নজর দেওয়ার সুযোগ শিক্ষকের খুবই কম, সেখানে এমন শিশুকে যে কোনও শিক্ষকই প্রশংসা করবেন।
কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণির আশপাশে এসে তার পড়ার সাবলীলতা কমতে শুরু করে। অথচ বিষয়টি কারও নজরে আসে না। কারণ, সে সত্যিই পড়তে পারে কি না, তা যাচাই করার জন্য আলাদা করে কোনও নির্দিষ্ট সময় রাখা হয়নি। বরং সে পরীক্ষায় পাশ করতে পারছে কি না, সেটাই হয়ে উঠেছে মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি। ভারতের সাম্প্রতিক শিক্ষা নীতিতে ‘ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমারেসি’ বা প্রাথমিক পঠন-পাঠন ও গণনাদক্ষতার উপর জোর দেওয়ার পিছনে এটাই অন্যতম প্রধান উপলব্ধি।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য, প্রতিটি শিশু যেন তৃতীয় শ্রেণি শেষ করার আগেই পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে এবং সাধারণ অঙ্ক করতে শেখে। পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠার আগে এই প্রাথমিক দক্ষতাগুলি নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দক্ষতা আপনা-আপনি তৈরি হয়ে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়া নয়।
ASER-এর উন্নতির পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, যেসব জায়গায় এই উদ্যোগ গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর করা হয়েছে, সেখানে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তবে যেখানে এই উদ্যোগ এখনও সেভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, সেখানে অনেকটা পথ চলা বাকি।
রিপোর্ট কার্ডের বাইরে অভিভাবকরা কী যাচাই করবেন?
অভিভাবকদের কাছে এই প্রতিবেদনের মূল বার্তা হল, পাশের নম্বরে ভরা রিপোর্ট কার্ড দেখে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে শুধু রিপোর্ট কার্ডের উপর নির্ভর করাও ঠিক নয়। তার বাইরেও সন্তানের প্রকৃত দক্ষতা যাচাই করা জরুরি।
খুব সহজ একটি পরীক্ষা করেই অভিভাবকরা বিষয়টি বুঝতে পারেন। নিজের শ্রেণির চেয়ে দু’ধাপ নীচের কোনও বই থেকে ছোট একটি অনুচ্ছেদ সন্তানকে জোরে জোরে পড়তে বলুন। অথবা সাহায্য ছাড়াই একটি সাধারণ বিয়োগের অঙ্ক করতে দিন। এতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগবে। কিন্তু সন্তানের প্রকৃত পড়ার ও অঙ্ক করার দক্ষতা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য পাওয়া যাবে, যা অনেক সময় স্কুলের আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট কার্ড থেকেও জানা যায় না।
যদি সন্তান এই কাজগুলি করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে, তাহলে বিষয়টি সরাসরি স্কুলের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। তবে অভিযোগের সুরে নয়। বরং নির্দিষ্টভাবে জানতে হবে, ঠিক কোথায় তার ঘাটতি রয়েছে এবং সেই ঘাটতি পূরণের জন্য স্কুলের কী পরিকল্পনা রয়েছে।
বাস্তবিক অর্থে, ভারতের স্কুলগুলিতে সাফল্য মাপার দু’টি আলাদা মাপকাঠি পাশাপাশি চলছে। একটি হল উপস্থিতি এবং পরীক্ষার নম্বর। অন্যটি হল, সামনে রাখা কোনও লেখা শিশু সত্যিই পড়তে পারছে কি না, কিংবা সাধারণ অঙ্ক করতে পারছে কি না।
তাই পরের বার সন্তানের রিপোর্ট কার্ড বাড়িতে এলে একটি প্রশ্ন করা জরুরি—সেই নম্বর আসলে সাফল্যের কোন মাপকাঠিকে তুলে ধরছে?
সূত্র: অ্যানুয়াল স্টেটাস অব এডুকেশন রিপোর্ট (ASER), প্রথম এডুকেশন ফাউন্ডেশন—তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়াদের প্রাথমিক পঠনদক্ষতা ও গণনাদক্ষতা সংক্রান্ত সর্বশেষ সমীক্ষার তথ্য এবং বিভিন্ন রাজ্যের তুলনামূলক পরিসংখ্যান। নিপুণ ভারত (NIPUN Bharat) প্রাথমিক পঠনদক্ষতা ও গণনাদক্ষতা মিশনের কাঠামো।