
একটি গ্রামের ১৪ বছরের মেয়ে প্রতি মাসে চুপচাপ কয়েক দিন করে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। কেন, তা কাউকে বলে না। শিক্ষকরা ভাবেন, মেয়েটির পড়াশোনায় আগ্রহ নেই। তার বাবা-মায়েরও হয়তো একই ধারণা। কিন্তু আসল কারণটা আরও সহজ এবং চাইলে সহজেই সমাধান করা যায়। মেয়েটির স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা, নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার নেই। তাই ঋতুস্রাবের সময় সহপাঠীদের সামনে সমস্যায় পড়ার চেয়ে সে বাড়িতে থাকাকেই বেশি নিরাপদ মনে করে।
এই ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি—স্কুলে মেয়েদের জন্য একটি উপযুক্ত শৌচাগার না থাকা—দেশজুড়ে একটি বড় সমস্যার অংশ। ইউনেস্কো ইন্সটিটিউট ফর স্ট্যাটেস্টিক্স (UNESCO Institute for Statistics)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৪০ শতাংশ মেয়ে দশম শ্রেণিতে পৌঁছনোর আগেই স্কুলছুট হয়ে যায়। এই পরিসংখ্যান চিন্তার কারণ, বিশেষ করে তাঁদের জন্য, যাঁরা মনে করেন ভারতে মেয়েদের শিক্ষার সমস্যা মূলত অতীতের বিষয়।
এর পিছনে সাধারণত কোনও একটি বড় ঘটনা কাজ করে না। বরং কয়েকটি নির্দিষ্ট এবং নথিভুক্ত সমস্যা ধীরে ধীরে একসঙ্গে কাজ করে। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরে যাওয়ার সময় এই সমস্যাগুলি আরও বেশি দেখা দেয়। এই সময়েই ভারতে সব শিশুর স্কুলছুট হওয়ার হার বাড়ে, তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি।
এর মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট এবং সহজে সমাধানযোগ্য সমস্যাগুলির একটি হল স্কুলের শৌচাগার ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা। গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বের অনেক স্কুলে এবং ভারতেরও অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত জল ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগারের অভাব রয়েছে। ঋতুস্রাবের সময় মেয়েদের যদি ব্যক্তিগত ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার না থাকে, তাহলে অনেকেই স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে থাকতে চায়। এর ফলে বছরে একাধিক দিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয় এবং ধীরে ধীরে পড়াশোনায় বড় ধরনের ক্ষতি তৈরি হয়। বিষয়টি শুধু লজ্জা বা অস্বস্তির নয়। এটি স্কুলের পরিকাঠামোর একটি সমস্যা, যার সরাসরি প্রভাব ফেলে মেয়েদের স্কুলে উপস্থিতির উপর।
এর সঙ্গে যোগ হয় স্কুলের দূরত্ব এবং নিরাপত্তার সমস্যা। প্রাথমিক স্কুলের তুলনায় মাধ্যমিক স্কুল সাধারণত বাড়ি থেকে আরও দূরে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার বা তারও বেশি হতে পারে। রাস্তা ভালোভাবে আলো না থাকলে বা গণপরিবহনের ব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য না হলে, মেয়েদের এতটা পথ যাতায়াত নিয়ে পরিবারগুলির মধ্যে নিরাপত্তার চিন্তা থাকে। যাতায়াতের পথে হয়রানিও অনেক গবেষণায় মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করার একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর মেয়েকে স্কুলে পাঠানো চালিয়ে যাবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পরিবারগুলি এই ঝুঁকিগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।
এরপর রয়েছে বাল্যবিবাহের সমস্যা। স্কুলে যাওয়া এবং বাল্যবিবাহ—দুটির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বের মোট বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ভারতের। গার্লস নট ব্রাইডস (Girls Not Brides)-এর গবেষণা বলছে, কোনও মেয়ে মাধ্যমিক স্তরে যত বেশি পড়াশোনা করে, তার কিশোরী অবস্থায় বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬ শতাংশ কমে।
এখানে সম্পর্কটা দু’দিক থেকেই কাজ করে। মেয়েরা যদি অল্প বয়সে স্কুল ছেড়ে দেয়, তাহলে তাদের কম বয়সে বিয়ে হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আবার কোনও পরিবার যদি মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ের পরিকল্পনা করে থাকে, তাহলে তারা তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াকে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতে পারে। ফলে দু’টি বিষয় একে অপরকে আরও শক্তিশালী করে।
সবশেষে রয়েছে পরিবারের আর্থিক চাপ। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাড়ির বিনা পারিশ্রমিকের কাজ, ভাই-বোনের দেখাশোনা এবং কৃষি বা গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করার চাপ থাকে। দরিদ্র পরিবারে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের কাজ করার প্রয়োজন হলে এই চাপ আরও বাড়ে। তখন মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার খরচ এবং সময়ের সঙ্গে ছেলের পড়াশোনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।
এই সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য দেশের সব গভীর সামাজিক মানসিকতা একসঙ্গে বদলে ফেলা জরুরি নয়। একটি ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার তৈরি করা পরিকাঠামোগত সমাধান। নিরাপদ এবং বাড়ির কাছাকাছি বাস বা যাতায়াতের ব্যবস্থা করা পরিবহণের সমস্যা সমাধানের উপায়। আবার মেয়েদের স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট বৃত্তি এবং শর্তসাপেক্ষে নগদ সহায়তা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা ভারতের একাধিক রাজ্যে কার্যকর হয়েছে। কারণ এতে পরিবারের আর্থিক হিসাবটা বদলে যায়। মেয়েকে স্কুলে রাখার খরচ কমে যায় এবং স্কুল থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন কমে।
শুরুতে বলা ১৪ বছরের মেয়েটির কথাই ভাবুন। তার সমস্যা এই নয় যে সে স্কুলে পড়তে চায় না। তার বাবা-মাও যে তার পড়াশোনার বিরোধী, এমনটা নয়। সমস্যাটি হল, প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট শারীরিক অসুবিধা তার স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠিন করে তুলছে। অথচ তাঁর আশপাশের কেউ বিষয়টিকে সমাধান করার মতো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না; বরং এমন কিছু হিসেবে মেনে নিচ্ছেন, যা তাঁকে সহ্য করতেই হবে।
একজন নাগরিক বা স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য তাই প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে মেয়েদের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কি না। বেশিরভাগ মানুষই ইতিমধ্যে মনে করেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ। আসল প্রশ্ন হল, নিজের এলাকার স্কুলে মেয়েদের পড়াশোনার পথে যে নির্দিষ্ট সমস্যাগুলি রয়েছে—শৌচাগার, স্কুলের দূরত্ব, নিরাপত্তা এবং খরচ—সেগুলি সত্যিই খতিয়ে দেখে একে একে সমাধান করা হয়েছে কি না। সমস্যাগুলিকে এমন কিছু হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়, যা সামাজিক কারণে কোনওভাবেই বদলানো সম্ভব নয়।
তথ্য সূত্র: UNESCO Institute for Statistics — ভারতে মেয়েদের মাধ্যমিক স্তরের স্কুলছুটের হার সংক্রান্ত তথ্য; Girls Not Brides — মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা ও বাল্যবিবাহের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা; স্কুলের শৌচাগার ও পরিচ্ছন্নতার পরিকাঠামো এবং ঋতুস্রাবের কারণে স্কুলে অনুপস্থিতি নিয়ে গবেষণা।