
কলকাতা: আধুনিক বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) প্রভাব নিয়ে আলোচনা ক্রমশ বাড়ছে। AI-র প্রয়োগ কোন কোন ক্ষেত্রে বাড়বে? কাদের চাকরি যেতে পারে? ভবিষ্যৎ বিশ্বে AI কতটা প্রভাব ফেলবে? এই সব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। AI-র ‘জাল’ কতটা ছড়াবে, তা নিয়ে এখনও বিজ্ঞানীরাও নিশ্চিত নন। এরই মধ্যে বিশ্বের বড় বড় সংস্থা AI-র নানা প্রোজেক্টে বিনিয়োগ করছেন। সেই বিনিয়োগ ক্রমশ বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে একটা ‘বুদবুদ’ তৈরি হয়েছে। আর এই নিয়েই আশঙ্কার কথা শোনালেন অর্থনীতিবিদ অরুণ কুমার। তাঁর আশঙ্কা, ২০০৮ সালে মার্কিন অর্থনীতিতে যেভাবে ধস নেমেছিল, AI-এ বিনিয়োগে অর্থনীতির ধস তার চেয়েও খারাপ হবে।
কী বললেন অর্থনীতিবিদ অরুণ কুমার?
অর্থনীতিবিদ অরুণ কুমার জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। ভারতীয় অর্থনীতি, কালো টাকা এবং জননীতি নিয়ে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এই সব বিষয়ে বইও লিখেছেন।
AI-এ বিনিয়োগ নিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করলেন। ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন প্রোজেক্টে বিনিয়োগে ৮০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। অরুণ কুমারের বক্তব্য, এটা AI ‘বুদবুদ’ নয়। এটা আর্থিক বুদবুদ। তাঁর কথায়, “আপনি যখন একটি প্রযুক্তিতে ৮০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছেন, তখন আপনার অর্থ সেখানে চলে যাচ্ছে।” এরপরই তিনি বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, এআই প্রতি সপ্তাহে উন্নত হচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে। এটা বাড়তেই থাকবে। এক প্রযুক্তি। তারপর অন্য প্রযুক্তি। তারপর তৃতীয় প্রযুক্তি। এটাকেই সিঙ্গুলারিটি বলে।”
মার্কিন কম্পিউটার বিজ্ঞানী তথা লেখক রে কার্জউইলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “রে কার্জউইল একজন দূরদর্শী ব্যক্তি। তিনি ২০০৫ সালে একটি বই লিখেছিলেন। ‘দ্য সিঙ্গুলারিটি ইজ নিয়ার’। সিঙ্গুলারিটির মানে বিশাল পরিবর্তন আসবে। এবং ২০২০ সালে তিনি বলেছিলেন, দ্য সিঙ্গুলারিটি ইজ হিয়ার। অর্থাৎ আমরা এখন সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছে গিয়েছি। কাছাকাছিও নয়। আমরা পৌঁছে গিয়েছি। তাই, এটা একটা বিশাল পরিবর্তন।”
এরপরই AI-তে বিনিয়োগ নিয়ে তাঁর বক্তব্য, “AI বেড়েই চলেছে। আর আপনি যে এতে বিনিয়োগ করছেন, এবছর ৭৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। গত বছর ৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি এখানে একটা আর্থিক বুদবুদ তৈরি হচ্ছে? উত্তর হল, হ্যাঁ।”
তাঁর আশঙ্কা, “এই বিনিয়োগের রিটার্ন পাওয়া যাবে না। যেহেতু নগদ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, রিটার্ন না পেলে আর্থিক ধস নামতে পারে। তাই, একটা ঝুঁকি রয়েছে। আর ঝুঁকিটা হল, কোম্পানিগুলো এত টাকা বিনিয়োগ করছে, আর এআই যদি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায়, তখন সে নিজেকে নিজেই উন্নত করতে থাকবে।”
এআই থেকে রিটার্ন না পেলে কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ কমাতে পারে। তখন কি এআই-র উন্নতি ধীর হয়ে যাবে? এই নিয়ে অর্থনীতিবিদ অরুণ কুমার বলেন, “এআই যদি সুপার ইন্টেলিজেন্ট হয়ে যায়, তখন সে নিজেই নিজেকে উন্নত করতে থাকবে। ফলে তার উন্নতি থামবে না। সেটা টেরও পাওয়া যাবে না। এটা কী করতে পারে, সেটাও বোঝা সম্ভব নয়। তবে আপনার আর্থিক ধস নামতে পারে।” তাঁর আশঙ্কা, মানুষের কাজও কমে যেতে পারে। বেকারত্ব বাড়বে। উৎপাদন ব্যবস্থা ধসে পড়তে পারে। মানুষের হাতে টাকা থাকবে না। সমাজে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
২০০৮ সালে আমেরিকায় অর্থনৈতিক ধস নেমেছিল। এআই-র আর্থিক বুদবুদ ফেটে গেলে তার থেকে বড় ধস নামতে পারে। তার প্রভাব শুধু আমেরিকা কিংবা চিনে পড়বে না। সারা বিশ্বে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন অর্থনীতিবিদ অরুণ কুমার। তাঁর কথায়, সেই ধসের প্রভাব পড়বে ভারতেও। কবে এই ধস নামতে পারে, তা নিয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বললেন না। তবে তিনি জানালেন, “এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে যদি এই গতি বজায় থাকে, তবে এক-দু’বছরের মধ্যে এর প্রভাব বোঝা যাবে।”