
কলকাতা: এ যেন লাইন লেগেছে ঘূর্ণিঝড়ের (Cyclone)! মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে আবার ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরে। অন্ধ্র-ওড়িশায় ‘অর্ণব’-ক্ষত শুকনোর আগেই জন্ম ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’র। নতুন ঘূর্ণিঝড়ের নিশানাতেও অন্ধ্র প্রদেশ। এমন গায়ে গায়ে ঘূর্ণিঝড়! সাগরের ‘রোষ’ দেখে হতবাক অনেকেই। মৌসম ভবন বলছে, বিরল অর্থাত্ নিয়মিত ঘটে না। কিন্তু নজিরবিহীন নয়। আবহাওয়া দফতরের দস্তাবেজ ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, ১৩ বছর আগে এর চেয়েও কম সময়ের ব্যবধানে ঘূর্ণিঝড়ের সাক্ষী বঙ্গোপসাগর।
ঘূর্ণিঝড় অর্ণব সৃষ্টি হয়েছিল ২৬ অক্টোবর। ২৭ অক্টোবর গভীর রাতে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ে অন্ধ্র প্রদেশ উপকূলে। ১ নভেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে জন্ম ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর। মৌসম ভবনের পূর্বাভাস, তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে সোমবার গভীর রাতে অন্ধ্র উপকূলেই আছড়ে পড়বে মুরাসু।
১৩ বছর আগেও নিশানায় ছিল অন্ধ্র প্রদেশই। ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় হেলেন-এর জন্ম হয়। মাঝে মাত্র তিন দিনের ব্যবধান। ২৪ নভেম্বর সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড় লহর। তবে লহর সাগরেই ঘূর্ণিঝড় তকমা হারায়। অন্ধ্র উপকূলে পৌঁছয় গভীর নিম্নচাপ রূপে। তার পরও ক্ষান্ত হয়নি বঙ্গোপসাগর, এর দু’সপ্তাহের মধ্যেই আবার ঘূর্ণিঝড়। সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড় মাদি, যায় তামিলনাড়ুতে।
পিঠোপিঠি ঘূর্ণিঝড়ের আরও উদাহরণ আছে। যেমন, ২০১৬ সালে ৭ দিনের ব্যবধানে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড় নাডা ও ঘূর্ণিঝড় ভরদা। ২০২০ সালে মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় বঙ্গোপসাগরে। ২৪ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় নিভার, ১ ডিসেম্বর ঘূর্ণিঝড় বুরেভি। দুই ঘূর্ণিঝড়ই যায় তামিলনাড়ুতে।
একটা প্রবণতা স্পষ্ট। অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বরে, অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড়ের দ্বিতীয় মরশুমেই গায়ে গায়ে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বেশি। বছরে দু’বার ঘূর্ণিঝড় মরশুম, একটি বর্ষার আগে, অন্যটি বর্ষার পরে। শুধু চলতি শতাব্দী নয়, গত শতাব্দীর তথ্যেও একই প্রবণতা। যেমন, ১৯৯২ সালে ৫ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বরের মধ্যে পর পর ৩টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় বঙ্গোপসাগরে।
আরব সাগরে নজর রাখা যাক। ইদানীংকালের মধ্যে ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল আরব সাগর। এক বছরে পাঁচ-পাঁচটি ঘূর্ণিঝড়। তার মধ্যে ২৫ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে পর পর ২ ঘূর্ণিঝড়টি সৃষ্টি হয় আরব সাগরে। দুটোই ‘বাহুবলী’। একটি সুপার সাইক্লোন কিয়ার, অন্যটি চরম তীব্র ঘূর্ণিঝড় মহা। আগে-পরে নয়, একইসময়ে আরব সাগরে দাপাচ্ছিল দু’-দু’টি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়।
নেপথ্যে একাধিক কারণ। মৌসম ভবনের ডিরেক্টর জেনারেল মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র TV9 বাংলাকে বলেছেন, ‘ম্যাডেন জুলিয়ান অসিলেশনের অনুকূল অবস্থান, শক্তিশালী নিরক্ষীয় তরঙ্গ, বঙ্গোপসাগর জুড়ে উষ্ণ জলতল, বঙ্গোপসাগরে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি এবং ভার্টিক্যাল উইন্ড শিয়ার কম, সবমিলিয়ে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পক্ষে আদর্শ আবহাওয়া।’
ম্যাডেন জুলিয়ান অসিলেশন, সহজ ভাষায় বলা যায় মেঘবাহী যাযাবর। যা মেঘ-বৃষ্টি-বাতাস নিয়ে পূর্ব অভিমুখে দুনিয়া সফর করে। যখন যেখানে থাকে, সেখানে বৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়। সঙ্গত করছে বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ জলতল। সাধারণত ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য জলতলের তাপমাত্রা অন্তত ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে হয়। এক সপ্তাহ আগেও বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ তল্লাটে জলতলের তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্ণব চলে যাওয়ার পর তা কমে হয়েছে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে সেটাও অনেকটাই বেশি।
সাগরে আপেক্ষিক আর্দ্রতা অনেক বেশি, অর্থাত্ জ্বালানির অভাব নেই। ভার্টিক্যাল উইন্ড শিয়ার কম অর্থাৎ, বায়ুমণ্ডলের নীচের স্তর ও উপরের স্তরের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ ও তার অভিমুখে বড়সড় পার্থক্য নেই। ফলে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগও পাচ্ছে ঘূর্ণিঝড়।
মুরাসু-র সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ, স্থলভাগের শুকনো হাওয়া। এবং সেটাই দেশবাসীর কাছে আশীর্বাদ। অর্ণবের মতো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা নেই মুরাসু-র। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলায় তেমন প্রভাব পড়বে না। সোমবার-মঙ্গলবার উপকূল ও লাগোয়া কিছু অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে বড়জোর। কালীপুজোয় শুকনো আবহাওয়া পাওয়ার আশাই বেশি। তার পর? সবই নির্ভর করবে বঙ্গোপসাগরের মর্জির উপর।