
কলকাতা: পদই কি সংঘাতের সূত্রধর? পদ না থাকলে কমে দূরত্ব? কেরলে তাঁর ‘বিশেষ দায়িত্ব’ রয়েছে, এই বলে বাংলা পর্বে ইতি টেনেছিলেন সিভি আনন্দ বোস। যা দেখে ‘বিস্মিত’ হয়েছিলেন খোদ মমতাও। আনন্দের বিদায় যেন ‘নিরানন্দ’ তৈরি করে দিয়েছিল রাজ্যের শাসকশিবিরের অন্দরে। কিন্তু এত তিক্ততা, এত সংঘাত — বিদায়বেলায় কি তা হলে সবটাই ভুলে যেতে হয়? রাজ্যের শাসকশিবির হয়তো সেই ভুলে যাওয়ার ‘অনুশীলন’টাই করছে। তাই তো কলকাতায় আচমকা প্রাক্তন রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কুণাল ঘোষ নিজের সমাজমাধ্যমে লিখে ফেললেন, “অভিমানে লোকভবনেও যাননি…”। এক সময় এই অভিমান, সংঘাত ছিল রাজ্যের সঙ্গে। যার নজির ফিরে-ফিরে এসেছে বারবার। তাই ফিরে দেখা সেই বিতর্কের দিনগুলো —
রাজ্যের সাহায্যপ্রাপ্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়োগের যে বিল রাজ্য বিধানসভায় পাশ হয়ে লোকভবনে ঝুলেছিল। রাজ্যপাল হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই প্রথম বিতর্কও শুরু হয় সেই বিল দিয়েই। বিবৃতি দিয়ে বাংলার প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস সাফ জানিয়ে ছিলেন, যেমন চলছে তেমনই চলবে। বাংলার শাসকশিবিরের সঙ্গে সরাসরি ও স্থায়ী সংঘাতের সূচনা যেন এই ঘটনাই। তবে এই পর্বে আরও একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন আনন্দ বোস। যার জল গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।
আচার্য হওয়ার বিলের ‘অপমৃত্যু’, সেই সূত্র ধরেই শুরু উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে জটিলতা। রাজ্যের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ করেন প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। এরপরেই তাঁর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হয় রাজ্য। তাঁদের যুক্তি ছিল, শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষা দফতরের সঙ্গে আলোচনা না করেই এই নিয়োগ করেছেন তিনি।
এই বিতর্কে জল এত দূর পর্যন্ত গড়ায় যে রাজ্যপালকে ‘ভ্যাম্পায়র’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। ঠিক কেন সেই মন্তব্য করেছিলেন তিনি? ২০২৩ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর সিভি আনন্দ বোসের কার্যকলাপ নিয়ে সমালোচনা করে তাঁকে মহম্মদ বিন তুঘলকের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন ব্রাত্য। এরপর দিন অর্থাৎ ৯ সেপ্টেম্বর বোস এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, “মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।”
এরপরেই সিভি আনন্দ বোসের ‘মধ্যরাতে অ্যাকশন’। রাত ১১টা ৪২ মিনিটে অধুনা রাজভবনের বর্তমান লোকভবন তরফে জানানো হয়, রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস একটি বার্তা পাঠিয়েছেন নবান্নে। সেই বার্তা গিয়েছে কেন্দ্র সরকারের কাছেও। তবে সেই ‘খামবন্দি’ চিঠি বরাবরই থেকেছে ‘মিস্ট্রি’। তবে উপাচার্য নিয়োগ নিয়েই যে ‘মিস্ট্রিয়াস চিঠি’ গিয়েছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে বিতর্কের ‘আগুনে ঘি ঢেলে’ সেই সময় সিভি আনন্দ বোসকে ‘ভ্যাম্পায়র’, ‘রাক্ষস প্রহর’ তকমা দিয়েছিলেন ব্রাত্য।
সংঘাত চড়েছিল ‘পিস রুম’ নিয়েও। পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় ছড়িয়ে পড়ে হিংসা। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ভাঙড়, ক্যানিং। চলে গুলি, পড়ে বোমা। সেই সময় প্রাক নির্বাচনী হিংসায় কঠোর অবস্থানের কথা জানান প্রাক্তন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। অধুনা রাজভবন, বর্তমান লোকভবন থেকে বিবৃতি জারি করে ‘পিস রুম’ খোলেন তিনি। তারপরেই পড়ে যান শাসকের নিশানায়। ‘পিস রুম’-এর এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন করেন প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ শান্তনু সেন। বলেন, “নির্বাচন কমিশনের আওতায় এখন সবকিছু। নির্বাচন আচরণ বিধির ঊর্ধ্বে কেউ নন, স্বয়ং রাজ্যপালও নন। সুতরাং এই সময় এটা কতটা করা যায় আমার জানা নেই।”
সন্দেশখালিতে থেকে মুর্শিদাবাদের হিংসা! ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে প্রতিবার রাজ্যের শাসকশিবিরের নিশানার মুখে পড়েছিলেন সিভি আনন্দ বোস। কখনও প্রশ্ন তুলেছিলেন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে। কখনও সওয়াল করেছেন রাষ্ট্রপতি শাসন জারির করার পক্ষে। যার পাল্টা প্রতিবারই তাঁকে ‘বিজেপির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ করেছে তৃণমূল।
এই বিতর্কের আগুন দাবানলে পরিণত হয়েছিল একটি অভিযোগ ঘিরে। তা হল শ্লীলতাহানির। আর রাজ্যপাল বনাম রাজ্য সংঘাতের এটাই যেন সবচেয়ে তিক্ত পর্ব। সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন রাজভবনের এক অস্থায়ী মহিলা কর্মী। কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছিলেন তিনি। তারপরই সরগরম রাজ্য রাজনীতি। প্রাক্তন রাজ্যপালকে তুলোধনা করতে ছাড়েনি শাসকশিবির। কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল বিজেপিকেও। খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাতজোড় করে বলেছিলেন, “বাবা রে! আমাকে আর রাজভবনে ডাকলে আমি আর যাব না। রাজভবনে আমি আর যাচ্ছি না ভাই। আমাকে রাস্তায় ডাকলে যাব। কথা বলতে হলে আমাকে রাস্তায় ডাকবেন। কিন্তু, যা কীর্তি-কেলেঙ্কারি শুনছি তাতে আপনার পাশে বসাটাও পাপ।” এই সময় বাংলার চার বিধানসভায় উপনির্বাচন হয়েছিল। শ্লীলতাহানির অভিযোগকে সামনে রেখে রাজভবনে শপথবাক্য পাঠ করতে যেতে চাননি বিজয়ী প্রার্থীরাও। ‘নিরাপত্তাহীনতার’ কথা বলেছিলেন বরাহনগরে জয়ী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সিভি আনন্দ বোসকে সরাসরি আক্রমণ। রাজভবনে বন্দুক-বোমা রাখার অভিযোগ তুলেছিলেন খোদ শ্রীরামপুর লোকসভার তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর দিন তিনেক রাজ্য রাজনীতির পারদ একেবারের চরমে। কল্যাণ বলেছিলেন, “রাজভবনে বসে ক্রিমিনালদের ডাকছেন। সবার হাতে একটা বন্দুক দিচ্ছেন, বোমা দিচ্ছেন।” তারপরই শুরু হয়েছিল চিঠি চালাচালি। সাধারণ মানুষের জন্য অধুনা রাজভবন, বর্তমান লোকভবন খুলে দিয়েছিলেন সিভি আনন্দ বোস।