
কলকাতা: বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্ক ভারতীয় রেলওয়ে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ যাত্রী ট্রেনে যাতায়াত করেন। শুধু ট্রেন চালানোর দায়িত্ব নয়, সেই ট্রেন চালাতে হয় ঘড়ি ধরে। রেলের এই সময়ানুবর্তিতা নিয়েই প্রকাশ পেল রিপোর্ট কার্ড। রিপোর্টে হাওড়া স্টেশনের হাল খারাপ! বাংলার মুখরক্ষা করল শিয়ালদহ-আলিপুরদুয়ার। সংসদে রিপোর্ট পেশ করল রেল মন্ত্রক।
দূরপাল্লার ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা নিয়ে রেল মন্ত্রকের সাম্প্রতিক রিপোর্টে একদিকে যেমন বাংলার কয়েকটি ডিভিশনের সাফল্য সামনে এসেছে, তেমনই প্রকট হয়েছে হাওড়া ডিভিশনের দুর্বল পারফরম্যান্স। দেশের ৭০টি রেলওয়ে ডিভিশনের সময়ানুবর্তিতা সংক্রান্ত পরিসংখ্যান বলছে, সেরা ডিভিশনগুলির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে শিয়ালদহ ও আলিপুরদুয়ার। অন্যদিকে, হাওড়া রয়েছে তালিকার ৪২ নম্বরে।
রেল মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের ৭০টি ডিভিশনের মধ্যে ২৩টি ডিভিশন ৯০ শতাংশের বেশি সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখতে পেরেছে। এই তালিকায় ৯৫ থেকে ৯৬.৭১ শতাংশ সময়ানুবর্তিতা নিয়ে শিয়ালদহ রয়েছে ১৪ নম্বরে। পূর্ব রেলের অন্যতম ব্যস্ত এই ডিভিশনের পারফরম্যান্স যথেষ্ট সন্তোষজনক বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, হাওড়া ডিভিশনের সময়ানুবর্তিতা ৮৪.০৫ শতাংশ। ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের বন্ধনীতে থাকা হাওড়ার স্থান ৪২। অর্থাৎ শিয়ালদহের সঙ্গে তুলনায় সময়ানুবর্তিতায় হাওড়ার পারফরম্যান্স যথেষ্ট পিছিয়ে।
পূর্ব রেলের অন্য ডিভিশনগুলির মধ্যেও পারফরম্যান্সে ফারাক স্পষ্ট। ৮৭.৬২ শতাংশ সময়ানুবর্তিতা নিয়ে মালদহ ডিভিশন ৩০ নম্বরে রয়েছে। আসানসোলের সময়ানুবর্তিতা ৭০.৬৩ শতাংশ, তার র্যাঙ্ক ৫৫। আরও পিছনে রয়েছে খড়্গপুর। মাত্র ৪০.৫২ শতাংশ সময়ানুবর্তিতা নিয়ে ৭০টি ডিভিশনের মধ্যে ৬৯ নম্বরে রয়েছে এই ডিভিশন।
বাংলার মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ফল করেছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশন। ৯৮.১৫ শতাংশ সময়ানুবর্তিতা নিয়ে জাতীয় তালিকায় সপ্তম স্থানে রয়েছে আলিপুরদুয়ার। ফলে সময় মেনে ট্রেন চালানোর ক্ষেত্রে বাংলার মুখরক্ষা করেছে শিয়ালদহ ও আলিপুরদুয়ার।
জাতীয় স্তরে অবশ্য শীর্ষে রয়েছে কোটা ডিভিশন। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেখানে সময়ানুবর্তিতা ১০০ শতাংশ। এরপর রয়েছে গুন্টাকাল ৯৯.৩৩ শতাংশ, আজমীর ৯৯.১৭ শতাংশ এবং সালেম ৯৯.১৫ শতাংশ। রাতলাম, পালাক্কাড, আলিপুরদুয়ার ও তিরুবনন্তপুরমেও সময়ানুবর্তিতা ৯৭ শতাংশের বেশি।
রেল কর্তাদের মতে, দূরপাল্লার ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল বিপুল ট্রাফিক এবং পরিকাঠামোগত চাপ। একই রেলপথে যাত্রীবাহী ও মালগাড়ি চলাচল, অত্যন্ত ঘন ট্রাফিক এবং বিভিন্ন জায়গায় রক্ষণাবেক্ষণের কাজের কারণে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
বিশেষ করে হাওড়া-দিল্লির মতো ব্যস্ত করিডরে একটি ট্রেন কয়েক মিনিট দেরি করলেই তার প্রভাব পরবর্তী একাধিক ট্রেনের উপর পড়তে পারে। কোন ট্রেন আগে যাবে, কোথায় ওভারটেকিং হবে, কোন ট্রেনকে লুপ লাইনে দাঁড় করানো হবে—এই ‘পাথিং’-এর সিদ্ধান্তও সময়ানুবর্তিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন রুটে পরিকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলায় অনেক সময় সাময়িক ভাবে ট্রেনের গতি কমাতে হয়। ফলে দীর্ঘ রুটের ট্রেন নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়ে।
রেলের এই পরিসংখ্যানের পর হাওড়া ডিভিশনের পারফরম্যান্স নিয়ে পূর্ব রেলের অন্দরে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে শিয়ালদহ ও আলিপুরদুয়ারের ভালো ফল ধরে রাখা, অন্যদিকে হাওড়া ও খড়্গপুরের মতো ডিভিশনের সময়ানুবর্তিতা বাড়ানো—এখন পূর্ব রেলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।