
চলচিত্র উৎসব, বইমেলা, হস্তশিল্প মেলা, পাড়ার রাস্তা, বিশ্রামাগার, নর্দমা, পায়খানা- সবই তৈরি হয়েছিল ‘অনুপ্রেরণায়’। এমন কোনও বাঙালি নেই, এই ‘অনুপ্রেরণা’ শব্দটির সঙ্গে পরিচয় হননি। বাংলা অভিধানে এই অনুপ্রেরণা শব্দের অর্থ কাউকে উৎসাহ দেওয়া। কিন্তু পায়খানা তৈরিতেও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ‘অনুপ্রেরণা’! বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই বুঝিয়ে দিয়েছে আর অনুপ্রেরণার প্রয়োজন নেই। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আর কোনও নামী-দামি ব্র্যান্ডের অনুপ্রেরণা থাকবে না, বাংলার জনতা জনার্দনই সর্বাগ্রে।” কিন্তু তৃণমূলের কেন প্রয়োজন পড়েছিল ‘অনুপ্রেরণা’ শব্দ? কেন এই শব্দ রাজ্যের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠে ব্যবহার করা হত? এর পিছনে কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে?
কখন থেকে শুরু অনুপ্রেরণা?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর একটা শব্দ ভীষণ ব্যবহার করত তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সততার প্রতীক। বিভিন্ন ব্যানারে, পোস্টারে সততার প্রতীক শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হত। তারপর ঘটে সারদার মতো দেশের অন্যতম তছরুপ দুর্নীতি। যেখানে তৃণমূলের তাবড় তাবড় নেতা-মন্ত্রীদের নাম জড়ায়। তার সঙ্গে নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও। অভিযোগ ওঠে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা একটি ছবি মোটা অঙ্কের মূল্যে কিনেছিলেন সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন। এরপর থেকে আস্তে আস্তে ‘সততার প্রতীক’ লেখা বিলীন হয়ে যায় বিভিন্ন পোস্টারে। আর তখন থেকেই শুরু হয় ‘অনুপ্রেরণা’ শব্দ।
মমতার পছন্দের শব্দ?
তৃণমূল মমতা কেন্দ্রিক একটি দল। অনেকে ঠাট্টা করে বলেন, একটিই পোস্ট বাকি সব ল্যাম্প পোস্ট। তৃণমূলও বিশ্বাস করে এটি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে তৃণমূল দল একটা দিনের জন্য ভাবতে পারেন না কোনও কর্মী। তাই মেলা উদ্বোধনের ফিতে কাটা থেকে শুরু করে দুঃস্থদের হাতে কম্বল তুলে দেওয়া— সর্বত্রই অনুপ্রেরণা শব্দটি এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পাড়ার ক্লাব যদি নিছক দৌড় প্রতিযোগিতাও আয়োজন করত, তবে সেখানেও মুখ্যমন্ত্রীর ছবি আর ‘অনুপ্রেরণা’ লেখা ব্যানার ছাড়া যেন উৎসবের আমেজ ঠিক জমে উঠত না। নাহ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি কখনই এই অনুপ্রেরণার কথা বলেননি, তবে বারণও করেননি। অন্তত, তেমনটা রেকর্ড নেই। তৃণমূলের অন্দরের খবর, এই অনুপ্রেরণা, মমতার পছন্দের শব্দ। যা ব্যবহার করলেই এলাকার বিধায়কের লেটার মার্কস প্রাপ্তি। পুরোটাই একটা আবছায়া মন জেতার খেলা।
অনুপ্রেরণা মানেই স্বীকৃতি!
তবে এই অতি-ব্যবহারের ফলে শব্দটির গাম্ভীর্য কতটা অক্ষুণ্ণ রইল, তা নিয়ে চায়ের দোকানে হাসাহাসিও কম হত না। আড্ডায় রসিকতা করে বলা হত, বৃষ্টির দিনে বাঙালির ঘরে খিচুড়ি রান্না হলেও বুঝি তার নেপথ্যে নবান্নের ডিরেক্ট অনুপ্রেরণা কাজ করছে। যদিও রসিকতা সরিয়ে রাখলে দেখা যায়, এই একমুখী ক্রেডিট দেওয়ার সংস্কৃতি বাংলার রাজনীতির এক নতুন ঘরানা তৈরি করেছিল। ব্যক্তিপুজো আর প্রশাসনিক সাফল্য একাকার হয়ে গিয়েছিল ওই অনুপ্রেরণা শব্দের মোড়কে। শেষ পর্যন্ত বাংলার মানুষের কাছে ‘অনুপ্রেরণা’ মানে শুধুই উৎসাহ ছিল না, এটি ছিল উন্নয়নের এক নীল-সাদা সিলমোহর, যা না থাকলে হয়তো বাংলার কোনও কাজই সরকারি স্বীকৃতি পেত না। অন্তত, ওয়াকিবহল মহল এমনই মনে করেন।
অনুপ্রেরণা যখন ব্যুমেরাং
বিধায়ক বা সাংসদ যখন কোনও শিলান্যাস করেন, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণা ব্যবহার করার একটা যুক্তি থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু পাড়ার কেষ্টু-বিষ্টুরা যখন খেলা-মেলা করেন, সেখানে লুকিয়ে থাকত কাটমানির অঙ্ক কিংবা ভয়, হুমকি। আর সবই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণা শব্দ ব্যবহার করে বলে অভিযোগ উঠত। উন্নয়ন আর কাটমানি যখন একই শব্দবন্ধে জড়িত থাকে, তখন অনুপ্রেরণা শব্দটির ব্যাখ্যা বদলে যায়।
সময় বদলেছে। গত ৪ মে-র পর থেকে বাংলা আপাতত এই সাদা-নীলের সর্বব্যাপী অনুপ্রেরণা থেকে মুক্ত। এমতাবস্থায় স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, এবার কি তবে বাংলার উন্নয়নের নেপথ্যে কোনও অনুপ্রেরণা থাকবে না? বিজেপির গেরুয়া শিবিরের নেতারা কি এই জাদুকরী ‘অনুপ্রেরণা’ ছাড়াই বাংলার জেলায় জেলায় উন্নয়নের চাকা ঘোরাতে পারবেন? উত্তর খুঁজতে গিয়ে ক্ষমতার নতুন অলিন্দে কান পাতলে অবশ্য বেশ চমৎকার ব্যাখ্যা মিলছে। কাঁথির বিজেপি সাংগঠনিক সহসভাপতি অসীম মিশ্র যেমন বেশ চওড়া হেসে সাফ জানিয়ে দিলেন, এবার থেকে সাধারণ মানুষই নাকি তাঁদের অনুপ্রেরণা।
একই সুর শোনা গেল তমলুকের বিজেপি সাংগঠনিক সভাপতি প্রলয় পালের গলায়। তিনি তো আরও এক কদম এগিয়ে একেবার রাষ্ট্রবাদের তত্ত্ব আউড়ে বললেন, তাঁদের সরকার নাকি ‘রাষ্ট্রবাদী সরকার’, তাই ওই চেনা ছকের ‘অনুপ্রেরণা’র বালাই এখানে থাকবে না, জনগণের সরকার শুধু জনগণের জন্যই কাজ করবে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কাঁথির বিজেপি বিধায়ক অরূপ কুমার দাস তো বেশ অবাক হয়েই জানালেন, তাঁদের নয়া মুখ্যমন্ত্রী তো এরকম কোনও জাদুকরী শব্দ ব্যবহার করার নিয়ম জারি করেননি। তাই ব্যবহারের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
বোঝা যাচ্ছে, নয়া জমানায় ‘অনুপ্রেরণা’ শব্দটির ভবিষ্যৎ অভিধানের সেই পুরনো মেজাজেই ফিরবে। এদিকে এই দলবদলের বাজারে ‘অনুপ্রেরণা’র আসল কারিগর কারা, তা জানতে বিভিন্ন জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও, তাঁরা যেন হঠাৎ করেই মৌনব্রত ধারণ করেছেন। একসময়ের সেই অতি-উৎসাহী গলায় এখন শুধুই থমথমে নীরবতা। সুতরাং, বাঙালি এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এটা দেখার জন্য যে, দেওয়ালে ‘অনুপ্রেরণা’র সিলমোহর না থাকলে পাড়ার রবীন্দ্রজয়ন্তী বা সুলভ শৌচালয়গুলো আগামী দিনে ঠিক কতটা সাড়ম্বরে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।