
কলকাতা: যাদবপুরকাণ্ডের প্রতিবাদে সোমবার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল বামপন্থী সংগঠনগুলো। সেদিনই মেদিনীপুরের কোতোয়ালি থানার লকআপে ঘটে যায় নৃশংস ঘটনা! প্রতিবাদে সামিল হওয়ায় AIDSO-র মহিলা সদস্যের ওপর অকথ্য অত্যাচারের অভিযোগ। অভিযোগ, দেওয়া হয় মোমের ছ্যাঁকা। চুল ধরে শূন্যে উঁচু করে পায়ের তলায় মার। চটুল বলিউডি গান চালিয়ে নাচতে বলে পুলিশ! এবার ভয়ঙ্কর অভিযোগ করলেন এআইডিএসও-র নিগৃহীত সমর্থকরা। উঠে আসে লকআপে পুলিশের নৃশংস অত্যাচারের অভিযোগ। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পুলিশ সুপার।
অভিযোগ এক, পায়ে জ্বলন্ত মোমবাতির ছ্যাঁকা, দুই, বেল্ট দিয়ে পেটানো, তিন, মুখে বুটের আঘাত, চার, চুল ধরে শূন্যে উঁচু করে পায়ের তলায় আঘাত, পাঁচ, মারধরের সময় চালিয়ে দেওয়া হয় চটুল বলিউডি গান, ড্রাগ কেসে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি। প্রত্যেকটি অভিযোগ কোতোয়ালি থানার মহিলা ওসির বিরুদ্ধে।
নিগৃহীত সুশ্রীতা সোরেন মুখে নিগ্রহের কথা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। তিনি বলেন, “৩ মার্চ আমাদের যে কর্মসূচি ছিল, তা মূলত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। আমরা কোনও রাস্তা অবরোধ, কিংবা এমন কোনও কাজ করিনি, যাতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের হেনস্থার মুখে পড়তে হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে পৌঁছানো মাত্রই বিশাল বাহিনী আমাদের তুলে নিয়ে যায়। থানায় নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্রকর্মীদের নামিয়ে চার জন ছাত্রীকে পাটনাবাজারে মহিলা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ ভ্যান থেকে নামিয়ে সিসিটিভি আওতার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে লাথি মেরে ফেলে দেওয়া হয়। মেঝের মাঝখানে চার জন মুখ থুবড়ে পড়ি। ওই অবস্থাতেই ওসি-সহ পাঁচ জন পুলিশ কর্মী মিলে চড়াও হয়। মারতে থাকে, লাথি, কিল, চড় ঘুষি মারে। সেই সময়ে ওসি কোমরের বেল্ট খুলে মারতে থাকেন।”
সুশ্রীতার দাবি, এরপর নাকি বাকি তিন জনকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য রুমে। তারপর একা তাঁর ওপর চলে অত্যাচার। তিনি বলেন, “আমাকে বলা হয়, তুমি মেঝেতে পা মিলিয়ে বসো, চুলের ক্লিপ খুলে ফেলো… আমি তাই করলাম। এরপর পাঁচ পুলিশ কর্মীকে ওসি বললেন তাঁরা যেন আমার পায়ের ওপর দাঁড়ান, তাঁরা দাঁড়ালে, বেত দিয়ে পায়ের তলায় মারতে থাকেন ওসি।” থানার অনেক জায়গা আছে, যেখানে পুঁতে দিলে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাবে না বলেও নাকি হুমকি দেন ওসি, সুশ্রীতার অভিযোগ তেমনই।
এমনকি জ্বলন্ত মোম গায়ে ফেসেও অত্যাচার করা হয় বলে অভিযোগ। শরীরের সেই ক্ষতচিহ্নও দেখান সুশ্রীতা। এরপরের অভিযোগ আরও ভয়ানক। সুশ্রীতাদের এইভাবে মারার পর নাকি স্নান করে ফ্রেশ হয়ে যেতে বলেন ওসি। যাতে শরীরে কোনও ক্ষতচিহ্ন না থাকে। অভিভাবকদের আসার আগে জোর করিয়ে স্নান করানো হয়।
নিগৃহীত আরও এক AIDSO কর্মী বর্ণালী নায়ক বলেন, “চেয়ারে বসে মুখে বুট দিয়ে লাথি মারা হয়েছে। রক্ত যখন বেরোচ্ছিল, তখন জোর করে জল খাইয়ে দেওয়া হয়।” তিনি বলেন, “আমাকে মারার সময়ে ওসি বলেন, আমাকে মেরে বলছে মজা পাচ্ছি না। এরপর হিন্দি গান চালিয়ে মারতে মারতে লাঠি ভেঙে দেয়!”
এ যেন সিনেমায় দেখানো অত্যাচারের দৃশ্য! অভিযোগকারী রানুশ্রী বেজ বলেন, “গাড়ি থেকে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ভিতরে নিয়ে গিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে লাথি মারে।” জেলা সম্পাদিক তনুশ্রী বেজ বলেন, “আমাদের বলছে, এমন ভাবে মারব যেন হাঁটতে না পারে। আমাদের জামা ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে। শৌচাগারে যেতে দেওয়া হয়নি দীর্ঘক্ষণ। রাত দুটোর সময় আমাদের থানা থেকে বের করে দেওয়া হয়।ওসি বলছিলেন, এমন জায়গায় মারো যেন চিহ্ন না থাকে।”
শিউরে ওঠার মতো এই অভিযোগ। ঘটনা সামনে আসতেই মানবাধিকার কর্মী রঞ্জিত শূর বলেন, “এটাই পুলিশের আসল রূপ। ভয়ঙ্করভাবে শাসকের দলদাস হিসাবে কাজ করছে। এই ঘটনা মেদিনীপুর নয়, গোটা রাজ্যেই হচ্ছে।”
এ প্রসঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, “এরকম নামে মহিলা, কিছু জাগরেল মহিলা, অসামাজিক জীবকে পুলিশের উর্দি পরিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। অসামাজিক জীব। যেভাবে অন্যায় আচরণ হয়েছে, বেআইনি। মেদিনীপুরে যা হয়েছে নৃশংস। খ্যাপা কুকুরের মতো তৃণমূল কংগ্রেস পুলিশকে লেলিয়ে দিয়েছে।” এই ঘটনায় পুলিশ সুপার ধৃতিমান সরকার বলেন, “এরকম ঘটনার কোনও অবকাশই নেই। সেখানে যথেষ্ট পরিমাণ সিরিয়র অফিসাররা উপস্থিত ছিলেন। মহিলা থানাতেই রাখা ছিল। রাতেই পরিবারের হাতে দিই। কেন এরকম অভিযোগ করছে জানি না। আমি বলব, একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জেলার নেতৃত্ব এটাকে ইস্যু করার চেষ্টা করছে। ”