
কলকাতা: সে-ও ছিল এক এপ্রিল। ১৩ বছর আগে সারদা দুর্নীতির কথা প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যে শোরগোল পড়েছিল। রাজনৈতিক নেতারা পরস্পরকে নিশানা করছিলেন। ১৩ বছর পর আর এক এপ্রিল। সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন সব মামলায় জামিন পেলেন। বৃহস্পতিবার জেল থেকে ছাড়া পেতে পারেন। রাজ্যে সব রাজনৈতিক দল যখন ভোটের প্রস্তুতিতে মগ্ন, তখন সুদীপ্ত সেনের জামিন নিয়ে ফের রাজনৈতিক মহলের হাওয়া গরম হতে শুরু করেছে। ভোটের সময় সুদীপ্ত জামিন পাওয়ায় কোনও রাজনৈতিক দলের কি অস্বস্তি বাড়ল? কলকাতা হাইকোর্ট সারদা কর্তার জামিন মঞ্জুর করতেই রাজনৈতিক চাপানউতোর বাড়ল। কোন রাজনৈতিক দল কী বলল?
সুদীপ্ত সেনের বিরুদ্ধে সবমিলিয়ে ৩৮৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮৭টি মামলায় আগেই জামিন পেয়েছেন তিনি। আর বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে বাকি দুটি মামলাতেও জামিন পেলেন। বিচারপতি উদয় কুমার এবং বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ শর্তসাপেক্ষে তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছে। সুদীপ্তর জামিনের আবেদন মঞ্জুর হতেই রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্যে ২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ। তার আগে ফের চর্চায় উঠে এল সারদা দুর্নীতি।
সারদা দুর্নীতিতে নাম জড়ায় শাসকদলের একাধিক নেতা-মন্ত্রীর। রাজ্যের পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে সিবিআইকে একটি চিঠি লিখেছিলেন সুদীপ্ত সেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা তাঁর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। পরে জেলবন্দি অবস্থায় আরও একাধিক চিঠি লেখেন সারদা কর্তা। সেখানে তিনি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেন। তবে শুভেন্দুর দাবি, সুদীপ্তকে ‘শিখিয়ে পড়িয়ে’ এসব লেখানো হয়েছে। সুদীপ্ত তাঁর চিঠি কংগ্রেস ও সিপিএমের একাধিক নেতারও নাম নেন। চিঠি পাঠান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে।
সবমিলিয়ে সারদা দুর্নীতিতে রাজনীতির যোগের অভিযোগ প্রথম থেকেই রয়েছে। এবার সুদীপ্ত সেনের জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম লেখেন, ‘তৃণমূল-বিজেপির সেটিং ধরে ফেলেছে বাংলা।’ তবে সেলিমের দলেরই নেতা তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য সুদীপ্ত সেনের জামিন নিয়ে বলেন, “ট্রায়াল শেষ করতে না পারলে কাউকে বেশিদিন আটকে রাখা যায় না। এটা ভারতের সাংবিধানিক আইন। সেই জন্য আমাদের যারা তদন্তকারী সংস্থা তারা ঠিকমতো তদন্ত না করলে, দ্রুত ট্রায়াল না করলে জামিন পাবেই। এর সঙ্গে অন্য কিছুর কোনও সম্পর্ক থাকার কথা নয়। এবং সম্পর্ক নেই।”
সারদা মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন তৃণমূলের বেলেঘাটার প্রার্থী কুণাল ঘোষ। এদিন সুদীপ্তর জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর তিনি বলেন, “যেকোনও বন্দির জামিনের আবেদন করার অধিকার রয়েছে। সেটা বিবেচনা করবে আদালত। আদালত বিবেচনা করে জামিন দিয়েছে। এটা সম্পূর্ণ আইনের ব্যাপার। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই।” আবার তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলছেন, “সারদার ঘটনার সূত্রপাত ভরা সিপিএমের সময়। সারদা কর্তা ধরা পড়লেন তৃণমূলের জমানায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কমিশনের বিরুদ্ধে সিপিএমের আইনজীবীরা মামলা করেছিলেন। তাহলে কাদের সুবিধা করে দিতে এই সময়ে মুক্তি। স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা থাকবে।”
ভোটের এই আবহে সুদীপ্ত সেনের জামিন নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “সুদীপ্ত সেন জেলের বাইরে থাকল কী ভেতরে থাকল, সেটা আলোচনার বিষয় হতে পারে না। সুদীপ্ত সেনের যে সম্পত্তি রয়েছে, তা বিক্রি করে প্রতারিতদের টাকা ফেরত দেওয়া যাবে কি? এটা আমাদের কাছে বড় প্রশ্ন। এটা ঠিকই, সুদীপ্ত সেনকে নিয়ে এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ চিন্তা করছে না। মানুষ জানে যা কিছু হয়েছে, তৃণমূলের অনুপ্রেরণায় হয়েছে, অনুমোদনে হয়েছে।”