
কলকাতা: রাজ্যে এই প্রথম। রাজনৈতিক হিংসায় যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের পরিবারের জন্য় বড় পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। এবার রাজনৈতিক হিংসায় মৃত ব্যক্তির পরিবারের একজন যোগ্য সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার হবে। গত সপ্তাহেই এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari)। কারা এই চাকরি পাবেন, কোন পদে চাকরি দেওয়া হবে, তা নিয়েই বিজ্ঞপ্তি জারি করল সরকার।
রাজ্যের তরফে জানানো হয়েছে, ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি বা তার পরে রাজনৈতিক হিংসার ঘটনায় যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের একজন নির্ভরশীল সদস্য এই সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবেন। রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প চালু করেছে রাজ্য সরকার। এই প্রকল্পের আওতায় মৃত ব্যক্তির পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি দফতরে গ্রুপ-ডি পদে চাকরি দেওয়া হবে।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য, বিগত কয়েক দশকে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এই ধরনের ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই মৃত ব্যক্তিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর গোটা পরিবারকে চরম আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে। সেই পরিবারগুলিকে আর্থিক সুরাহা দিতে এবং তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতেই এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে।
রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি বা তার পরে রাজনৈতিক হিংসার ঘটনায় যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের পরিবারের যোগ্য সদস্যরা এই প্রকল্পের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
তবে একটি পরিবার থেকে শুধুমাত্র একজনকেই এই প্রকল্পের আওতায় চাকরির জন্য বিবেচনা করা হবে। একই রাজনৈতিক হিংসার ঘটনায় মৃত ব্যক্তির পরিবারের কেউ যদি ইতিমধ্যেই ক্ষতিপূরণ হিসাবে সরকারি চাকরি পেয়ে থাকেন, তাহলে ওই পরিবার নতুন করে এই প্রকল্পের সুবিধা পাবে না।
এই প্রকল্পের আওতায় রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতর, অধিদফতর, কালেক্টরেট এবং অন্যান্য সরকারি অফিসে গ্রুপ-ডি পদে নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে।
এর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত পদ তৈরি করা হবে। অর্থাৎ, সরকারি দফতরগুলিতে বর্তমানে যে পদগুলি রয়েছে, সেগুলির উপর কোনও প্রভাব না ফেলেই এই বিশেষ নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে।
তবে আবেদন করলেই যে চাকরি নিশ্চিত, এমনটা নয়। আবেদনকারীর যোগ্যতা যাচাই করবে স্ক্রিনিং কমিটি। পাশাপাশি পদ তৈরি ও অনুমোদন, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং মেডিক্যাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াও বাধ্যতামূলক।
এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে হলে নির্ধারিত ফর্ম-এ (Form-A) পূরণ করে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসকের কাছে আবেদন জমা দিতে হবে। যে জেলায় রাজনৈতিক হিংসার ঘটনাটি ঘটেছিল, সেই জেলার জেলাশাসকের কাছেই আবেদন করতে হবে।
আবেদনের সঙ্গে কয়েকটি প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। সেগুলি হল—
আবেদন জমা পড়ার পর জেলা স্তরের স্ক্রিনিং কমিটি তা খতিয়ে দেখবে। আবেদন পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে এই কমিটিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরপর সুপারিশ স্বরাষ্ট্র দফতরে পাঠানো হবে।
কোনও আবেদনকারী জেলা স্তরের স্ক্রিনিং কমিটির সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হলে, তিনি আপিল করতে পারবেন। সিদ্ধান্ত জানানোর ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফর্মবি (Form-B) পূরণ করে রাজ্য স্তরের কমিটির কাছে আবেদন জানাতে হবে।
তবে সন্তোষজনক কারণ থাকলে, ৩০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও আপিল গ্রহণ করতে পারবে রাজ্য স্তরের কমিটি। আপিল জমা পড়ার সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জেলা স্তরের কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসক। সদস্য হিসেবে থাকবেন পুলিশ সুপার অথবা কলকাতার ক্ষেত্রে ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের মনোনীত একজন প্রসিকিউশন অফিসার।
অন্যদিকে, রাজ্য স্তরের কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব বা প্রধান সচিব। এই কমিটিতে আইন দফতর, অর্থ দফতর, রাজ্য পুলিশের ডিজি-আইজিপি এবং কলকাতা পুলিশের কমিশনারের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
এই প্রকল্পে চাকরি পাওয়া ব্যক্তিকে প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ফর্ম-সি (Form-C) জমা দিতে হবে। সেখানে অঙ্গীকার করতে হবে যে তিনি মৃত ব্যক্তির পরিবারের অন্যান্য নির্ভরশীল সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবেন।
এ ছাড়া চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রশিক্ষণ, প্রবেশন, স্থায়ীকরণ, সিনিয়রিটি এবং অন্যান্য চাকরির শর্তাবলি গ্রুপ-ডি পদের জন্য প্রযোজ্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
রাজ্য সরকারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক হিংসায় উপার্জনকারীকে হারানো পরিবারগুলিকে আর্থিকভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই প্রকল্পের অধীনে চাকরি পাওয়া কোনও স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হবে এবং সমস্ত যোগ্যতা ও যাচাইয়ের শর্ত পূরণ করতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ রাজ্য সরকার আলাদাভাবে নির্ধারণ করবে। সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলে নতুন আবেদন আর গ্রহণ করা হবে না।