
কলকাতা: কোনও চোর ছাড়া পাবে না। তার জন্য বিল আনবে স্বরাষ্ট্র দফতর। মঙ্গলবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে একথা বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এবার গুন্ডা দমনে বিল আনতে চলেছে রাজ্য সরকার। সোমবার বিধানসভায় পেশ হবে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোস্যাল অ্যাকটিভিজ বিল, ২০২৬’। এছাড়া, কংগ্রেস আমলের পুরনো আইন সংশোধনের জন্য পেশ করা হবে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। কী কী থাকছে পাবলিক সেফটি বিলে? জেনে নিন খুঁটিনাটি।
বিধানসভায় কী বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী?
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বিজেপির স্লোগান ছিল ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’। এমনকি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভোট প্রচারে এসে বারবার সেই বার্তা দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার বিধানসভায় বক্তব্য রাখার সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “কোনও চোরকে ছাড়া হবে না। আমরা শপথ নিয়েছি, কোনও চোর জেলের বাইরে থাকবে না। অনেকে ভাবছেন জেলে গিয়ে, ২ মাস জামিনে বেরিয়ে এলাম। তা হবে না। বিল আনছি। সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করব। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে অকশন করব।” মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর হাতেই রয়েছে স্বরাষ্ট্র দফতর। সেই স্বরাষ্ট্র দফতর গুন্ডা দমনে সোমবার বিধানসভায় বিল পেশ করবে।
‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোস্যাল অ্যাকটিভিজ বিল, ২০২৬’-র উদ্দেশ্য কী?
স্বরাষ্ট্র দফতর বলছে, এই বিলের উদ্দেশ্য হল জননিরাপত্তা বজায় রাখা । শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা। যাদের সরকার ‘অসামাজিক’ বা ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক আটক। এলাকা ছাড়ার নির্দেশ, তল্লাশি ও বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা ইত্যাদি।
‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘গুন্ডা’ কাকে বলা হচ্ছে?
আটক করার ক্ষমতা-
বিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল আটক করার ক্ষমতা। পুলিশ সুপার বা তাঁর ঊর্ধ্বতন কোনও পুলিশ আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার যদি মনে করে যে কোনও ‘গুন্ডা’-কে আটক করা দরকার যাতে সে ভবিষ্যতে অসামাজিক কাজ করতে না পারে, তাহলে আটকের নির্দেশ দিতে পারবে।
আটক করার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ শর্ত-
জেলাশাসক কিংবা পুলিশ কমিশনারও আটক করার নির্দেশ দিতে পারবেন-
আটক করার আদেশ রাজ্যের যে কোনও জায়গায় কার্যকর করা যাবে-
এই আইনে আটক করার আদেশ জারি হলে, তা পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও স্থানে কার্যকর করা যাবে, ঠিক যেমন গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়।
আটক ব্যক্তিকে কোথায় রাখা হবে-
আটক হওয়া ব্যক্তিকে পশ্চিমবঙ্গের কোনও সংশোধনাগারে রাখা হবে যা সরকার স্থির করবে।
পলাতক হলে কী হবে-
আটক ব্যক্তিকে কী জানাতে হবে?
অ্যাডভাইজরি বোর্ড-
এই আইনের অধীনে রাজ্য সরকার এক বা একাধিক Advisory Board গঠন করবে। বোর্ডে থাকবেন, একজন চেয়ারপার্সন, যিনি হাইকোর্টের বিচারপতি বা প্রাক্তন বিচারপতি। আরও দু’জন সদস্য, যাঁরা হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্য।
কাজ কী?
যে কাউকে আটক করা হবে, সেই মামলা ৩ সপ্তাহের মধ্যে এই বোর্ডের কাছে পাঠাতে হবে।
বোর্ড কী করবে?
নথি দেখবে। প্রয়োজন হলে আরও তথ্য চাইবে। আটক ব্যক্তি চাইলে তাকে শুনানির সুযোগ দিতে পারে। ৯ সপ্তাহের মধ্যে সরকারকে মতামত দেবে যে আটক রাখার যথেষ্ট কারণ আছে কি না।
ফলাফল-
যদি বোর্ড বলে যথেষ্ট কারণ আছে, সরকার আটকে রাখতে পারবে। যদি বোর্ড বলে যথেষ্ট কারণ নেই, সরকারকে আটক করার নির্দেশ বাতিল করে মুক্তি দেবে। আটক ব্যক্তি সাধারণভাবে আইনজীবী নিয়ে বোর্ডে হাজির হওয়ার অধিকারী নন। তবে বোর্ড চাইলে বিশেষ ক্ষেত্রে অনুমতি দিতে পারে। এই আইনের অধীনে সর্বোচ্চ আটকে রাখা ১২ মাস পর্যন্ত হতে পারে। পুরনো আটকের পরে আবার নতুন করে আটক করা যাবে। সরকার যে কোনও সময় আটক বাতিল বা সংশোধন করতে পারে।
কিন্তু আটক করার আদেশ উঠে গেলে বা মেয়াদ শেষ হলে আবারও একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আবার নতুন করে আটক করার নির্দেশ দেওয়া যাবে-
সাময়িক মুক্তি-
এলাকা ছাড়ার নির্দেশ-
যদি জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার, বা সরকার অনুমোদিত ডিআইজি পদমর্যাদার বা তাঁর ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসার মনে করেন যে কোনও ‘গুন্ডা’ অসামাজিক কাজে জড়িত বা জড়াতে চলেছে, তাহলে তাকে শুনানির সুযোগ দিয়ে নির্দেশ দিতে পারবেন—
(ক) এলাকা ছাড়ার নির্দেশ-
(খ) চলাফেরার ওপর নজরদারি-
আপিলের সুযোগ-
এই আদেশের বিরুদ্ধে ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে আপিল করা যাবে।
আদেশ ভাঙলে শাস্তি-
এই নির্দেশ অমান্য করলে তিন বছর পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা হতে পারে।
আশ্রয় দিলে শাস্তি-
যে ব্যক্তি জানে বা বিশ্বাস করার কারণ আছে যে কারও বিরুদ্ধে এই আইনে আটক করার নির্দেশ বা বহিষ্কারাদেশ জারি হয়েছে, তবু তাকে আশ্রয় দেয় বা লুকিয়ে রাখে। তাহলে আশ্রয়দাতা হিসাবে তার দুই বছর পর্যন্ত জেল ও জরিমানা হতে পারে।
তল্লাশি ও বাজেয়াপ্তের ক্ষমতা-
সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করলে সরকার কিংবা সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে মামলা নয়-
যদি রাজ্য সরকার বা কোনও সরকারি কর্মকর্তা এই আইনের অধীনে সৎ উদ্দেশ্যে (good faith) কোনও কাজ করেন বা করার চেষ্টা করেন, তাহলে সেই কাজের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা বা অন্য কোনও আইনি পদক্ষেপ করা যাবে না।
অর্থাৎ, সরকার বা পুলিশ বলতে পারবে—তারা ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ কাজ করেছে। তাতে তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার কঠিন হয়ে যেতে পারে।
অপরাধ হবে Cognizable এবং Non-bailable-
সরকার নিয়ম বানাতে পারবে-
এই আইন কার্যকর করতে রাজ্য সরকার আলাদা করে Rules বা নিয়ম তৈরি করতে পারে।
বিলে বলা হয়েছে, সমাজের কিছু অংশ অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত। বর্তমান আইন তা ঠেকাতে যথেষ্ট কার্যকর নয়। তাই আরও কঠোর আইন আনা দরকার। যাতে এই ধরনের কাজ দমন, শাস্তি ও প্রতিরোধ করা যায়। জানা গিয়েছে, সোমবার ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-ও পেশ করা হবে।