
কলকাতার মানচিত্রে ‘হরিশ’ নামটির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট এবং ভবানীপুর অঞ্চলের রাজনীতির অলিগলি যাঁরা চেনেন, তাঁদের কাছে ‘হরিশ মুখার্জি রোড’ এবং ‘হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট’ অত্যন্ত পরিচিত নাম। বাংলার বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বসতভিটে এই হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটেই। আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের নির্বাচনী কেন্দ্র ভবানীপুরের প্রধান সংযোগকারী রাস্তা হলো হরিশ মুখার্জি রোড। কিন্তু এই দুই ‘হরিশ’ আসলে কারা? অনেকেই নাম দুটি গুলিয়ে ফেলেন, তবে ইতিহাসের পাতায় এই দুই ব্যক্তিত্বের পরিচয় সম্পূর্ণ আলাদা।
কলকাতার ইতিহাস নিয়ে লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভবানীপুরের প্রধান রাস্তাটি যাঁর নামে, সেই হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৮২৪-১৮৬১) ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ তবে তাঁর কিশোর বয়স ছিল কষ্টে ঘেরা। খুব অল্প বয়সেই সংসার চালানোর কারণে তাঁকে পড়াশুনো ছেড়ে চাকরি জীবনে পা রাখতে হয়। তবে ইংরেজি ভাষায় দারুণ দখল থাকার কারণে, বৃটিশ কোম্পানিতেই চিঠি লেখার কাজ পেয়েছিলেন হরিশ। কিন্তু তখনই কেউ জানত, এই হরিশই ভবিষ্যতে সেই বৃটিশ আমলাদের বিরুদ্ধেই কলম ধরবেন! সময় এগোতেই হরিশচন্দ্র হয়ে ওঠেন নির্ভিক এক সাংবাদিক। তিনি ছিলেন বিখ্যাত ‘হিন্দূ প্যাট্রিয়ট’ (The Hindoo Patriot) পত্রিকার সম্পাদক। ব্রিটিশ আমলে যখন নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে বাংলার কৃষকদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছিল, তখন হরিশচন্দ্র তাঁর কলমকে তলোয়ারের মতো ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর শাণিত লেখনি নীল চাষের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তিনি কেবল লিখতেনই না, নিজের উপার্জনের সবটুকু খরচ করতেন নীল চাষিদের আইনি লড়াইয়ে সাহায্য করতে। শোনা যায়, তাঁর বাড়িতে নীল চাষিদের অবারিত দ্বার ছিল। নীলকরদের করা মানহানির মামলা এবং লড়াইয়ের ধকল সইতে না পেরে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মূলত তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই ভবানীপুরের এই দীর্ঘ রাস্তাটির নামকরণ হয়।
অন্য দিকে, হরিশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নামটি যেন ইতিহাসে অনেক বেশি উপেক্ষিত। কলকাতার ইতিহাস নিয়ে লেখা নানা প্রবন্ধ বা লেখায়, তাঁর স্থান খুবই অল্প। তবে যতটুকু তাঁর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়, হরিশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ভবানীপুর অঞ্চলের এক গণ্যমান্য এবং বিত্তবান ব্যক্তিত্ব। বলা ভালো একজন দাপুটে জমিদার। কলকাতার ইতিহাস নিয়ে লেখা যেকটা প্রবন্ধ রয়েছে, সেখান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হরিশ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচিতি ছিল মূলত তাঁর জনহিতকর কাজের জন্য। ভবানীপুর ও কালীঘাট অঞ্চলের উন্নয়ন এবং জনকল্যাণে তিনি প্রভূত অর্থ ও জমি দান করেছিলেন। কালীঘাট মন্দির সংলগ্ন এই এলাকায় তাঁর পরিবারের ব্যাপক প্রভাব ছিল। লোকহিতৈষী এই মানুষের নামেই পরে রাস্তাটির নামকরণ করা হয় ‘হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট’।
ভৌগোলিক ভাবে হরিশ মুখার্জি রোড এবং হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট খুব কাছাকাছি হলেও, এই দুই নাম দুই ভিন্ন আদর্শের কথা বলে। একজন ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বুদ্ধিজীবী কলমচি, আর অন্যজন ছিলেন সমাজসেবী ও দানবীর ব্যক্তিত্ব। বাংলার রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে এই দুই রাস্তাই সমার্থক হয়ে উঠেছে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে। তবে ভবানীপুরের এই দুই ‘হরিশ’ই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বাংলার ইতিহাসে আজও চিরস্মরণীয়।
তথ্য: একে রায়, The Early History And Growth Of Calcutta
অজিত সেন, কলকাতার রাজপথ: সমাজে ও ইতিহাসে