
সমিতা সাহা কর্মকার (SEBI শংসায়িত বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ)
যুদ্ধের আঁচে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য। আর সেই আঁচের ছ্যাঁকা অনুভব করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে তেল রফতানিতে। শেয়ার বাজারও ধাক্কা খেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে ভারতের শেয়ার বাজারে কেন প্রভাব পড়ল? জেনে নেওয়া যাক কারণ…
যদি কোনও দুটি দেশের যুদ্ধে ভারত জড়িয়ে না পড়ে, আর যদি কোনও বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি না দেখা দেয়, তাহলে খুব বেশি দিন শেয়ার বাজারে তার আলোড়ন থাকে না। কিন্তু যুদ্ধ যদি তেল উৎপাদক দেশের সঙ্গে হয়, তাহলে চিন্তার কারণ আছে। যেমন এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধে। ইরান বিশ্বের চতুর্থ তেল উৎপাদক। শুধু তাই নয়, বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পার হয় ইরানের ৩৩ কিলোমিটার স্ট্রেট অব হরমুজ প্রণালীর মধ্যে দিয়ে। আর ওই হরমুজ প্রণালী যুদ্ধের কারণে ইরান বন্ধ করে দিয়েছে। ইরান তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৮৫ মার্কিন ডলার থেকে চড়চড়িয়ে বেড়ে ১১৫ ডলার পার করে গিয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের বিশেষত্ব হল, তা ব্যবহার হয় পেট্রল, ডিজেল, বিমানের তেল, গ্যাসোলিন, লুব্রিক্যান্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল হিটিং, কেমিক্যাল, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পেট্রোকেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি এবং আরও বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে, যা উন্নয়নের জন্য অবশ্যম্ভাবী। ভারতের নিজস্ব অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ক্ষমতা ২০ শতাংশ। আর বাকি ৮০ শতাংশ আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে।
বেশি দাম দিয়ে তেল কিনতে হলে ভারতের বিদেশি মুদ্রা বেশি খরচ হবে। বিদেশি মুদ্রার তুলনায় দেশের টাকার মূল্য কমে যাবে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন (ডেপ্রিসিয়েশন অব রুপি) হবে। অর্থাৎ ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমে যাবে। যদি বেশি দিন ধরে এমন চলতে থাকে তাহলে ব্যবসা বাণিজ্যে চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে। জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। আর মুদ্রাস্ফীতির সমস্যা দেখা দেবে (ইনফ্লেশনারি প্রেসার)। এইরম পরিস্থিতির আশঙ্কায় শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে নিজের টাকা তুলে নিরাপদ আশ্রয়ে (সেফ হেভেন অ্যাসেটস) বিনিয়োগ করে। যার মধ্যে সর্বোপরি হল সোনা।
শেয়ার বাজারে বড় মাত্রায় বিনিয়োগ করে বিদেশি সংস্থানগুলি, যাদের বলা হয় FII। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্য, শেয়ার বাজার থেকে লাভ করা। কিন্তু যুদ্ধের সময় তারাও শেয়ার বিক্রি করে নিজের টাকা তুলে নিজের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যায় (ক্যাপিটাল ফ্লাইট)। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা বাণিজ্যে মুনাফা কমে যায়। শেয়ারের দাম পড়ে যায়। এবং সবটাই একটা চেইন এফেক্টের মতো চলতে থাকে।
বাড়তি দামে তেল কেনার জন্য বিদেশি মুদ্রা শেষ হওয়ার ভয় থাকলে সরকার বিদেশি মুদ্রা ধার নেয়। সেই ধার শোধ করতে হয় বিদেশি মুদ্রা দিয়েই। এর ফলেও মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়। এই সব মিলিয়ে দেশের উন্নয়নের পথে একটি বাধার সৃষ্টি হয়। শুধু ভারত নয়, এর প্রভাব পড়ে বিশ্বের সমস্ত দেশে। কারণ তেলের প্রয়োজন সব দেশেরই।
তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে যখন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলতা ঘটে, তাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন সাপ্লাই শক। এখন ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধের মাশুল গুনবে কারা, সেটাই দেখার।