
বিকেলের পড়ন্ত রোদ হোক কিংবা বৃষ্টির ভেজা দুপুর— বাঙালির মুখরোচক আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলো মুড়ি। কিন্তু এই সাধারণ মুড়ি যখন রাস্তার ধারের জাদুকরী ছোঁয়ায় ভেলপুরি বা ঝালমুড়িতে রূপান্তরিত হয়, তখনই তৈরি হয় এক চিরন্তন বিতর্ক। দেখতে অনেকটা একরকম হলেও, স্বাদ, গন্ধ এবং প্রস্তুতির কৌশলে এই দুই পদের মধ্যে রয়েছে যোজন যোজন পার্থক্য। একদল যদি সর্ষের তেলের ঝাঁজে মজে থাকেন, তবে অন্যদলের পছন্দ তেঁতুলের চাটনির চটপটে টক-মিষ্টি স্বাদ।
ঝালমুড়িতে লুকিয়ে আছে তার ঝাঁজালো সর্ষের তেল এবং বিশেষ ভাজা মশলায়। এখানে মুড়ির সঙ্গে মেশানো হয় ছোলা, বাদাম, নারকেল কুচি আর কুচানো আদা। এর স্বাদ মূলত নোনতা এবং তীব্র ঝাল। ঝালমুড়ি মাখার সময় যে মশলাযুক্ত তেল ব্যবহার করা হয়, তার সুবাসই বলে দেয় এটি খাঁটি বাঙালির ঘরানা। সাধারণত ট্রেন বা বাসের সফর কিংবা গঙ্গার ধারের আড্ডায় কাগজের ঠোঙায় যে বস্তুটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, তা হলো এই ঝালমুড়ি।
অন্যদিকে, ভেলপুরি হল স্বাদের এক জটীল সমীকরণ। মুম্বইয়ের চৌপাটি থেকে এর উৎপত্তি বলে মনে করা হলেও এখন এটি সারা ভারতের সম্পদ। ভেলপুরিতে মুড়ির আধিপত্য থাকলেও এর প্রধান অনুষঙ্গ হলো প্রচুর পরিমাণে পাপড়ি আর ঝুরিভাজা। এখানে সর্ষের তেলের বদলে ব্যবহার করা হয় ঘন তেঁতুলের চাটনি এবং কখনও কখনও পুদিনার সবুজ চাটনি। আলুর দম বা সেদ্ধ আলুর ছোট ছোট টুকরো আর টমেটো কুচি ভেলপুরিকে ঝালমুড়ির তুলনায় অনেক বেশি নরম এবং রসালো করে তোলে।
পরিবেশনার ধরনেও এদের মেজাজ আলাদা। ঝালমুড়ি মানেই সেই নস্টালজিক সরু লম্বা ঠোঙা, যার ভেতর থেকে নারকেল কুচি খুঁজে পাওয়াটাই এক পরম তৃপ্তি। আর ভেলপুরি সাধারণত পরিবেশিত হয় শালপাতার বাটি বা প্লেটে। ঝালমুড়ি যদি হয় একরোখা এবং সরাসরি ঝাল, ভেলপুরি তবে টক-মিষ্টি-ঝাল সব মিলিয়ে এক উৎসব। উপকরণের এই সূক্ষ্ম বদলই এক সাধারণ মুড়িকে করে তোলে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতির প্রতীক। শেষ পর্যন্ত লড়াইটা শ্রেষ্ঠত্বের নয়, বরং মেজাজের— আপনি আজ সর্ষের তেলের ঝাঁজে ডুব দেবেন নাকি তেঁতুলের চাটনির জাদুতে? বাকিটা ব্যক্তিগত!