
“কই মাছের প্রাণ”— অতি পরিচিত এই বাংলা প্রবাদটি আমরা বহুবার ব্যবহার করেছি সহনশীলতা বা কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু প্রবাদের কথা ছেড়ে যদি বিজ্ঞানের পাতায় চোখ রাখা যায়, তবে প্রশ্ন ওঠে— কেন এবং কীভাবে কোনও জলজ প্রাণী জল ছাড়াও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডাঙায় কিংবা শুকনো মাটিতে অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে? প্রাণীবিদদের মতে, এই অলৌকিক ক্ষমতার নেপথ্যে রয়েছে প্রকৃতিপ্রদত্ত এক বিশেষ শারীরিক গঠন এবং অনন্য অভিযোজন ক্ষমতা।
সাধারণত যেকোনও মাছ ফুলকার সাহায্যে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে শ্বাসকার্য চালায়। জল থেকে ডাঙায় তুললে ফুলকাগুলো একসঙ্গে সেঁটে যায়, ফলে বাতাস থেকে অক্সিজেন শোষণের ক্ষমতা হারিয়ে মাছটি অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়। কিন্তু কই মাছের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা।
কই মাছের মাথার দুই পাশে, ঠিক কানকোর ঠিক পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক বিশেষ শ্বাসযন্ত্র, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘অ্যাকসেসরি এয়ার-ব্রিদিং অর্গান’ (Accessory Air-breathing Organ) বা অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র। এটি দেখতে অনেকটা জটিল ও কুঁচকানো গোলাকার গোলকধাঁধার মতো। একে ল্যাবিরিন্থিন অঙ্গ (Labyrinth organ) বলা হয়। এই অঙ্গটি বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি অক্সিজেন টেনে নিয়ে রক্তে সরবরাহ করতে পারে। এর ফলেই জল থেকে ডাঙায় তোলার পরও কই মাছ ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখতে সক্ষম হয়।
তবে কেবল শ্বাসযন্ত্রই নয়, কই মাছের ডাঙায় বেঁচে থাকা এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের পেছনে রয়েছে আরও দুটি বড় কারণ।
১) কই মাছের চামড়া এবং কানকোর ভেতরের আর্দ্রতা দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিশেষ শ্বাসযন্ত্র ও কানকো পুরোপুরি শুকিয়ে না যাচ্ছে, ততক্ষণ তারা বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি বৃষ্টির দিনে বা ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে এরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে।
২) ডাঙায় উঠে কই মাছ কেবল স্থির হয়ে পড়ে থাকে না, বরং বঁড়শির মতো শক্ত কানকো এবং শক্তিশালী বক্ষ-পাখনার ওপর ভর দিয়ে মাটির ওপর বুক ঘষে একেবেঁকে সামনে এগিয়ে চলে। এক জলাশয় শুকিয়ে গেলে এইভাবেই এরা ডাঙা দিয়ে হেঁটে অন্য জলাশয়ের খোঁজে পাড়ি জমায়। এই কারণেই ইংরেজিতে এদের ‘ওয়াকিং পার্চ’ বলা হয়।
প্রকৃতির এই অদ্ভুত সৃষ্টি ও বিবর্তনের ক্ষমতা কই মাছকে প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার এক অনন্য দক্ষতা দিয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে আজও এক বিস্ময়ের বিষয়।