
শিম ভাজা থেকে শুরু করে মাছের ঝোল কিংবা চটচটে চচ্চড়ি—বাঙালির রান্নাঘরে শিমের উপস্থিতি নিত্যদিনের। তবে শিম রান্নার সময় অনেকেই এর ভেতরের বীজ বা দানা নিয়ে সামান্য দ্বিধায় পড়েন। অনেকে কচি বীজ খেতে ভালোবাসলেও, শিমের পাকা বা কাঁচা বীজ পেটে গেলে শারীরিক কোনও সমস্যা হবে কি না—তা নিয়ে নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞান এবং সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র কী বলছে? শিমের বীজ পেটে গেলে শরীরে ঠিক কী প্রভাব পড়ে, দেখে নেওয়া যাক।
আন্তর্জাতিক খাদ্য ও পুষ্টিবিষয়ক গবেষণাপত্র জার্নাল অফ ফুড সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (Journal of Food Science and Technology)-র একাধিক সমীক্ষা অনুযায়ী, শিমের বীজ কেবল সুস্বাদু নয়, এটি পুষ্টি উপাদানে ভরপুর।
১. শিমের বীজ হলো প্রোটিন এবং খাদ্য আঁশের (Dietary Fiber) চমৎকার উৎস। যারা নিরামিষাশী, তাঁদের জন্য এটি শরীরের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে।
২. বীজে থাকা দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় ফাইবার পরিপাকতন্ত্রকে সক্রিয় রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে।
৩. এর কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ বাড়তে দেয় না। ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি একটি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার।
৪. শিমের বীজে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পটাসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সাহায্য করে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও কাঁচা বা অপরিণত শিমের বীজ সরাসরি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
খ্যাতনামা পুষ্টিবিদ এবং গবেষকদের মতে, শিমের বীজে স্বাভাবিকভাবেই ‘লেকটিন’ (Lectin) এবং ‘ফাইটেটস’ (Phytates) নামের অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্ট বা ক্ষতিকর উপাদান থাকে। বিশেষ করে কাঁচা বা আধসেদ্ধ শিমের বীজে ‘ফাইটোহেম্যাগ্লুটিনিন’ (Phytohaemagglutinin) নামক এক ধরনের লেকটিন জাতীয় প্রোটিন থাকে।
কাঁচা অবস্থায় শিমের বীজ পেটে গেলে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো হতে পারে?
লেকটিন পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে উদ্দীপনা তৈরি করে, যার ফলে তীব্র পেটে ব্যথা হতে পারে। কাঁচা বীজের বিষাক্ত উপাদান হজম না হয়ে দ্রুত বমি বা ডায়রিয়ার লক্ষণ তৈরি করতে পারে। বীজে বিদ্যমান জটিল শর্করা (Oligosaccharides) সহজে হজম হতে চায় না, ফলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া তা ভেঙে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং খাদ্য বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বক্তব্য—শিমের বীজ খাওয়া অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর, তবে তা অবশ্যই সঠিকভাবে সেদ্ধ বা রান্না করে খেতে হবে।
শিমের শুকনো বা শক্ত বীজ রান্নার আগে অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখা উচিত। এতে লেকটিন ও ফাইটেটসের মাত্রা অনেকটাই কমে যায়। বীজ অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভালোভাবে উচ্চ তাপমাত্রায় সেদ্ধ করলে ভেতরের বিষাক্ত অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্ট সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় এবং এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে ওঠে।
কচি শিমের ভেতরের নরম বীজ তরকারিতে রান্না করে খেলে সাধারণত কোনো ঝুঁকি থাকে না, তবে তা-ও কাঁচা না খাওয়ার পরামর্শই দেন চিকিৎসকরা। সুতরাং, শিমের বীজ পেটে গেলে চিন্তার কিছু নেই—যদি তা সঠিকভাবে সেদ্ধ ও রান্না করা হয়ে থাকে। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় সঠিকভাবে প্রস্তুত করা শিমের বীজ রাখলে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দূর করবে নানা শারীরিক জটিলতা।