
সোশ্যাল মিডিয়ায় আজকের মতো রিলস, স্ক্রোলিং কিংবা অ্যালগরিদমের দৌরাত্ম্য শুরু হওয়ার অনেক আগে, ইন্টারনেটের দুনিয়ায় মানুষের সঙ্গে মানুষের আসল সংযোগের অর্থ শিখিয়েছিল ‘ওরকুট’ (Orkut)। ২০০৪ সালে গুগলকর্মী ওরকুট বাইয়ুককিতেন (Orkut Buyukkokten) এই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছিলেন, যা নব্বইয়ের দশক বা তার আশপাশের প্রজন্মের কাছে এক আবেগের নাম। আর ঠিক এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার পর, বর্তমানের ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের রমরমা বাজারে ফের একবার কামব্যাকের জল্পনা উসকে দিয়েছে এই ক্লাসিক সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটটি।
বর্তমানে ‘orkut.com’-এ গেলে একটি ভিন্ন ছবি দেখতে পাবেন ব্যবহারকারীরা। সাইটটি খুললেই যে বার্তাটি সামনে আসে, তা হল— “আমি চাই ওরকুট এমন একটি নতুন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তৈরি করুক যা খাঁটি মানুষ, সত্যিকারের সংযোগ এবং প্রকৃত আপন করে নেওয়ার অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।” বর্তমানে পুরনো সেই নস্টালজিয়াকে ফিরিয়ে আনতে এবং সত্যিকারের ব্যবহারকারীদের একত্রিত করতে একটি বিশেষ ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে ওরকটের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট।
সাইটটিতে একটি পিটিশন বা অনলাইন স্বাক্ষর অভিযান চলছে, যেখানে ব্যবহারকারীদের অনুরোধ করা হচ্ছে তাঁরা যেন এতে অংশ নেন। ইতিমধ্যেই বিশ্বের প্রায় ১১৫টি দেশ থেকে ২ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এই পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন।
ওরকুটের মূল ওয়েবসাইটের অন্যতম বড় আকর্ষণ হল এর প্রতিষ্ঠাতা ওরকুট বাইয়ুককিতেন-এর একটি খোলা চিঠি। বর্তমানের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে এসেছে বলে কড়া সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, ইন্টারনেটের দুনিয়া এখন অর্থহীন এনগেজমেন্ট, বিজ্ঞাপন আর শুধু দৃষ্টি আকর্ষণের জায়গায় পরিণত হয়েছে, যেখানে অর্থপূর্ণ সম্পর্কের কোনও জায়গা নেই। এআই (AI)-এর দ্রুত আগ্রাসন এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
চিঠিতে বাইয়ুককিতেন লিখেছেন, “দুযুগেরও বেশি সময় আগে আমি প্রথম দিকের কিছু সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলাম। আপনাদের সঙ্গেই আমিও দেখেছি কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া আস্তে আস্তে ভুল পথে চালিত হয়েছে।” ইন্টারনেটের আদি স্বর্ণযুগের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, তখন ভিনদেশের অচেনা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা এক অন্যরকম রোমাঞ্চ তৈরি করত, কারণ সেই মিথস্ক্রিয়াগুলো ছিল নিখাদ ও খাঁটি। কিন্তু যুগের পরিবর্তনে প্ল্যাটফর্মগুলো যখন শুধুই ইউজার এনগেজমেন্ট বাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, তখনই সব বদলে গেল।
বর্তমান প্রজন্মকে অ্যালগরিদমের খাঁচায় বন্দি হতে দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এমন একটা ফিড তৈরি করা হয়েছে যা সংযোগের পরিবর্তে শুধু এনগেজমেন্টের ওপর জোর দেয়। এর ফলে এক গোটা প্রজন্মের ছোটরা এমন সব অ্যালগরিদমের শিকার হয়েছে যা তাদের আসক্ত করেছে, বিভক্ত করেছে এবং বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছে পণ্যের মতো বিক্রি করেছে।” এর ফলেই আজকের দিনে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একাকীত্ব এবং মানসিক অবসাদ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সোশ্যাল মিডিয়ার মৌলিক ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেছেন বাইয়ুককিতেন। কারণ, একটি কথোপকথনের অপর প্রান্তে রক্তমাংসের কোনও মানুষের উপস্থিতি থাকাই যেখানে মূল কথা ছিল, আজ সেখানে এআই সেই জায়গাটি দখল করতে শুরু করেছে। ইন্টারনেটের জগতকে আরও বেশি মানবিক ও অর্থবহ করে তুলতে তাই বিশ্ববাসীকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।