
গরম ভাতের সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা ভাপা ইলিশ বা রুই মাছের কালিয়া— বাঙালির পাতে মাছ থাকবে না, তা কি কখনও হয়? কাঁটা বেছে মাছ খাওয়ার এই ঝক্কি পোহাতে হয় কমবেশি প্রায় সবাইকে। ছোটবেলায় মা-ঠাকুমারা তো বলেই থাকেন, মাছ খেলে বুদ্ধি বাড়ে। কিন্তু কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, বেচারা মাছগুলোর শরীরে এত কাঁটা বা ফিশ বোন (Fish Bone) কেন থাকে? শুধু কি গলায় ফোটার জন্যই এদের জন্ম, নাকি এর পেছনে রয়েছে প্রকৃতির অপূর্ব কৌশল?
মাছের শরীরে কাঁটা থাকে কেন?
সহজ কথায় বলতে গেলে, মাছের শরীরে কাঁটা হল আসলে তাদের কঙ্কালতন্ত্র বা স্কেলিটনের (Skeletal System) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষের যেমন শক্ত হাড় রয়েছে, যা আমাদের শরীরকে খাড়া রাখতে এবং সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে, জলের নিচে মাছের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনই। জলজ প্রাণীদের বেঁচে থাকার জন্য পেশির নমনীয়তা এবং শরীরের সঠিক আকৃতি বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। আর সেই কাজটাই নিখুঁতভাবে করে এই কাঁটাগুলো।
কী কাজ করে এই কাঁটারা?
মাছের শরীরের কাঁটাগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়— মেরুদণ্ড এবং ইন্ট্রামাসকুলার বোন বা ইন্টারমাসকুলার হাড় (Intermuscular Bones)। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে মাছের কাঁটার কাজ বহুমুখী।
১) মাছ যখন জলের তীব্র স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটে, তখন তাদের শরীরের পেশিগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। এই কাঁটাগুলো পেশির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকে এবং সাঁতার কাটার সময় পেশিকে প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা ও সাপোর্ট জোগায়।
২) জলের মধ্যে দিক পরিবর্তন করা এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য মাছের শরীরকে বাঁকাতে হয়। এই কাঁটাগুলো স্প্রিংয়ের মতো কাজ করে, যা মাছকে জলের মধ্যে সহজে বাঁক নিতে এবং ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৩) অনেক সময় কাঁটাগুলো শিকারী প্রাণীদের হাত থেকেও মাছকে রক্ষা করে। কারণ গলায় কাঁটা বিঁধে যাওয়ার ভয়ে অনেক বড় মাছ বা পাখিরা ছোট মাছ খেতে চায় না।
বিজ্ঞানিদের মতে, সমুদ্রের মাছের (যেমন পমফ্রেট, রূপচাঁদা বা টুনা) তুলনায় মিষ্টি জলের বা নদীর মাছের (যেমন রুই, কাতলা, মৌরলা) শরীরে কাঁটার পরিমাণ অনেক বেশি হয়। এর কারণ হল নদীর জল স্থির নয়, বরং তাতে ঘূর্ণন ও স্রোত থাকে। স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কাটতে গিয়ে মিষ্টি জলের মাছগুলোকে পেশির ওপর বেশি জোর দিতে হয়। আর সেই কারণেই বিবর্তনের ধারায় তাদের পেশির মাঝখানে অতিরিক্ত কাঁটা বা ইন্টারমাসকুলার বোন তৈরি হয়েছে। আসলে জলের নিচে সাঁতার কেটে বেঁচে থাকার জন্যই প্রকৃতির এই অপূর্ব দান হল মাছের এই কাঁটা।