
বাঙালির ভোজনরসিকতার ইতিহাস বহু পুরোনো। উৎসব-অনুষ্ঠানে বাসমতি কিংবা গোবিন্দভোগের কদর যতটাই থাকুক না কেন, প্রতিদিনের পাতে গরম ধোঁয়া ওঠা ঝরঝরে ভাতের জন্য মধ্যবিত্ত বাঙালির প্রথম পছন্দ কিন্তু ‘বাঁশকাঠি’। চালের দোকানদারকে নামটা বললেই বস্তা থেকে বেরিয়ে আসে ধবধবে সাদা, অতি সরু আর লম্বা দানার চাল। কিন্তু কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই চালের এমন নাম কেন হল? কোনও খাবারের সঙ্গে বাঁশের কাঠের কী সম্পর্ক থাকতে পারে?
গ্রামীণ বাংলায় কোনও জিনিসকে চেনানোর জন্য তার রূপ বা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল রেখে নামকরণ করার এক বিশেষ রীতি রয়েছে। ধান বা চালের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। লোকশ্রুতি থেকে জানা যায়, ‘বাঁশকাঠি’ চালের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটি অত্যন্ত সরু, কিছুটা শক্তপোক্ত এবং সোজা-লম্বা দানাদার। শুকনোর পর বা সেদ্ধ করার পরও এর দানা সহজে ভাঙে না বা বেঁকে যায় না। বাঁশের শুকনো কঞ্চি বা পাতলা চেরা কাঠি যেমন সরু, সোজা এবং মজবুত হয়—ঠিক তেমনই এই চালের গঠনও হুবহু বাঁশের তৈরি ছোট কাঠির মতো দেখায়। সেই দৃশ্যগত সাদৃশ্য থেকেই সহজ-সরল গ্রামবাংলায় এই চালের নাম হয়ে যায় ‘বাঁশকাঠি’।
আবার অনেকের ধারণা, এটি হয়তো প্রাচীন কোনও দেশি ধানের জাত। তবে কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, আজকের বাজারে আমরা যে ‘বাঁশকাঠি’ চাল পাই, তা মূলত উচ্চ ফলনশীল সরু জাতের ধানেরই প্রসেস করা একটি রূপ। মূলত বর্ধমান, মেদিনীপুর, বীরভূম এবং হুগলির বিস্তীর্ণ কৃষি এলাকায় এই চালের ব্যাপক ফলন হয়। ধান কেটে চাল তৈরির পর বিশেষ ‘মিলিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে এর উপরিভাগ পালিশ করে অতি সরু রূপ দেওয়া হয়। প্রাচীন বাংলায় কৃষকেরা যখন প্রথম এই সরু ধানের উদ্ভাবন বা চাষ শুরু করেন, তখন ধানের শিষ থেকে পাওয়া লম্বা-সরু চাল দেখে সাধারণ চাষিরাই একে বাঁশের কাঠির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতেই শেষপর্যন্ত হাটে-বাজারে চালের ব্র্যান্ড হিসেবে পাকা জায়গা করে নেয় ‘বাঁশকাঠি’।