
ট্রেনে যাতায়াত তো কমবেশি সকলেই করেছেন, কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন যে রেল ট্র্যাকে কেন এত পাথর বিছিয়ে রাখা থাকে? এটা তো বাকি কোথাও থাকে না। অনেকে ভাবেন, এগুলি রেললাইনের নিচে রাখা সাধারণ পাথর। কিন্তু এটা ব্যসল্ট পাথর। এই পাথর রাখার পিছনেও রয়েছে বিশেষ কারণ।

ভাবুন তো একটা ট্রেনের ওজন কয়েকশো টন হয়। তার উপরে মালগাড়িতে প্রচুর ভারী জিনিস নিয়ে যাওয়া হয়। সেই মিলিয়ে প্রায় হাজার টন ওজন হয়ে যায় ট্রেনের। আসলে এই ভর বহনের জন্যই রেললাইনে পাথর বিছিয়ে রাখা হয়।

ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেগে ছোটে অধিকাংশ মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন। এত দ্রুত গতিতে ছোটার সময় ট্রেনের ইঞ্জিন এবং তার পিছনের বগিগুলির ওজনের চাপ পুরোটাই রেললাইনের দুটি লোহার পাতের ওপর পড়ে। যদি সেই চাপ সরাসরি মাটির ওপর পড়ে, তাহলে মাটি বসে যাবে বা রেললাইন পুরোপুরি বেঁকে যাবে।

রেললাইনের নীচে লম্বাভাবে যে কাঠের বা কংক্রিটের ব্লকগুলো রাখা হয়, সেগুলিকে স্লিপার বলা হয়। এই স্লিপারগুলির নীচে কাঁকর বা পাথর ট্রেনের তৈরি ভারী ওজন ও চাপকে শুধু একটি জায়গায় না ছড়িয়ে, ট্র্যাক জুড়ে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয় এবং মাটিতে স্থানান্তরিত করে। এতে মালগাড়ি বা ট্রেন যতই ভারী হোক না কেন, ট্র্যাকটি স্থিতিশীল থাকে।

যখন ট্রেন দ্রুত গতিতে ট্র্যাকের উপর দিয়ে যায়, তখন তীব্র কম্পন হয়। ট্রেনের গতির কারণে সেই কম্পনের ফলে রেললাইনগুলি সামনে-পিছনে সরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই ধরনের নড়াচড়া আটকাতে, এই পাথরগুলি কংক্রিটের স্লিপারগুলোকে ধরে রাখে, যা রেললাইনকে দুই পাশে শক্তভাবে আটকে রাখে।

এই নুড়ি পাথরগুলি একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এখানে পাথর না থাকলে, ট্রেনের গতির কারণে রেললাইন একদিকে সরে যায়, যার ফলে বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। একইভাবে, রোদে লোহা প্রসারিত হয়। ঠান্ডায় লোহা সংকুচিত হয়। এই সময়ে এই পাথরগুলি অনেকটা স্প্রিংয়ের মতো কাজ করে। রেললাইনকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং তার অবস্থান থেকে সরে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। এগুলি রেললাইনের মাঝের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

রেললাইনে ব্যবহৃত পাথরগুলি নদী বা পুকুরে পাওয়া গোলাকার, মসৃণ পাথর নয়। এগুলো খুব ধারালো এবং এদের কিনারাগুলো এবড়োখেবড়ো হয়। এর পিছনেও বিশেষ কারণ আছে। রেললাইনে গোলাকার পাথর বিছানো হলে, ট্রেনের চাপে সেগুলো একে অপরের উপর দিয়ে পিছলে যাবে এবং পাশে সরে যাবে। অন্যদিকে, এই ধারালো পাথরগুলো একে অপরের সঙ্গে আটকে যায়। ট্রেন যতই দ্রুত চলুক না কেন, এটি পাথরগুলোকে নড়াচড়া করতে বাধা দেয়।

এছাড়া বর্ষাকালে রেললাইনের উপর জল জমে থাকলে, নীচের মাটি আলগা হয়ে যায়। মাটি দুর্বল হয়ে গেলে ট্রেন চলার সময় রেললাইন বসে যায়। কিন্তু এই নুড়ি পাথরের গঠনের কারণে যতই বৃষ্টি হোক না কেন, জল সঙ্গে সঙ্গে পাথরের ফাঁক দিয়ে নীচে গড়িয়ে পাশে চলে যায়। এতে রেললাইন সবসময় শুকনো ও মজবুত থাকে। এছাড়াও এই পাথরগুলো রেললাইনের মাঝখানে কোনো গাছপালা জন্মাতে বাধা দেয়।

বর্তমানে আমরা কিছু মেট্রো রেললাইন বা আধুনিক সেতুতে নুড়ি পাথরের ট্র্যাক দেখতে পাই না। পাথরের পরিবর্তে তারা বিশাল কংক্রিটের ভিত্তি তৈরি করে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। রেললাইনে নুড়ি পাথর না থাকলে, কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রেনের ভারে ট্র্যাকগুলো মাটিতে বসে যাবে এবং আগাছায় ভরে যাবে। বৃষ্টি হলে তা কাদাকাদা হয়ে যাবে এবং রেল ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।