
হিন্দু ধর্মে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম বা সংস্কার। এর মধ্যে বিয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালি পরিবারে আজও একটা অলিখিত নিয়ম কাজ করে- বড় ভাই বা বোনের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত ছোটদের বিয়ের পিঁড়িতে বসতে দেওয়া হয় না। অনেকে একে নিছক ‘সামাজিক লোকলজ্জা’ মনে করলেও, এর গভীরে রয়েছে প্রাচীন শাস্ত্রীয় বিধান এবং অনুশাসন। হিন্দু ধর্মে একে কেবল নিয়ম ভাঙা নয়, রীতিমতো ‘পাপ’ বা ‘দোষ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কেন এই নিয়ম মানা হয় জানেন?
‘পরিবেদন’ দোষ: শাস্ত্র কী বলছে?
প্রাচীন শাস্ত্রকাররা এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। মনুস্মৃতি থেকে শুরু করে যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি- সব জায়গাতেই জ্যেষ্ঠাধিকার বা বয়সের ক্রম মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। শাস্ত্রে একটি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে— ‘পরিবেদন’। সহজ কথায়, বড় ভাই অবিবাহিত থাকা অবস্থায় যদি ছোট ভাই বিয়ে করে, তবে সেই কাজটিকে বলা হয় ‘পরিবেদন’। যিনি এই কাজ করেন অর্থাৎ সেই ছোট ভাইকে শাস্ত্রে ‘পরিবেত্তা’ বলা হয়। আর যে বড় ভাই অবিবাহিত থেকে গেলেন, তাঁকে বলা হয় ‘পরিবিত্ত’। মনুস্মৃতির তৃতীয় অধ্যায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, এই পরিস্থিতিতে কেবল ভাইরা নন, বরং যে কন্যাসন্তানের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে, সেই কন্যা, যিনি কন্যাদান করছেন এবং যে পুরোহিত এই বিয়ে সম্পন্ন করছেন—এই পাঁচজনই সমানভাবে পাপের ভাগী হন।
কেন এই কঠোর নিয়মের প্রচলন করা হল?
এবার প্রশ্ন জাগতেই পারে কেন এই নিয়মের প্রচলন হল? এক জনের বিয়ের সঙ্গে অন্যজনের পাপ পুণ্যের সম্পর্কই বা কী? আসলে আগেকার দিনের সমাজ ছিল পরিবার ভিত্তিক, আর তাই শৃঙ্খলা বজায় রাখাই ছিল মূল লক্ষ্য।
বড় ভাই বা বোনকে মা বাবার পরেই জায়গা দেওয়া হয়। ফলে তাঁদের টপকে ছোটরা যদি আগে বিয়ে সারেন তাহলে পরিবারের পদমর্যাদাগত ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে বড়দের অসম্মান করা হয় বলে মনে করা হয়।
বড় ভাই বা বোনের আগে ছোট ভাই বা বোনের বিয়ে হলে। সমাজ প্রশ্ন তোলে। আর তাতে বড় ভাই বা বোনের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে, ফলে পরিবারের শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে।
আবার প্রাচীন মতে, কুল ধর্ম বা পিতৃপুরুষের তর্পন করার প্রধান অধিকার জ্যেষ্ঠ পুত্রের। তাই আচার পালনের বেশ কিছু নিয়মের জন্য বাড়ির বড় ছেলের আগে সংসারী হওয়া উচিত।
শাস্ত্রে কি কোনও ছাড় আছে?
বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে বড়র আগে ছোটর বিয়েতে কোনো বাধা নেই। যেমন যদি বড় ভাই বা বোন শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ থাকেন, যদি তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন অথবা যদি তিনি দেশান্তরী হন (অর্থাৎ বহু বছর ধরে তাঁর কোনও খোঁজ নেই)। এছাড়া যদি বড় জন নিজে থেকে আজীবন অবিবাহিত থাকার প্রতিজ্ঞা করেন, তবে ছোটদের বিয়েতে কোনো ‘পরিবেদন’ দোষ লাগে না।
বর্তমান সময়ে অনেক পরিবারেই পেশা বা উচ্চশিক্ষার খাতিরে এই নিয়ম ভাঙতে দেখা যায়। তবে আধ্যাত্মিক এবং শাস্ত্রীয় দিক থেকে বিচার করলে, আজও বড়দের সম্মান ও পরিবারের শৃঙ্খলা রক্ষার্থেই এই প্রাচীন রীতিকে মান্যতা দেওয়া হয়।