
টিভি নাইন বাংলা ডিজিটালের পাতায় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত। প্রতি পর্বে উঠে আসবে ঠাকুরের নানা উক্তি ও তার ব্যাখা। আজ প্রথম পর্ব।
বসন্তকাল। ফেব্রুয়ারি মাস। বাইরে ঠান্ডাটা বেশ জোড়ালো। সেবারই কলকাতার রিপন কলেজের অধ্য়াপক মহেন্দ্রনাথ গুপ্তর ওরফে মাস্টারের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় শ্রীরামকৃষ্ণের। সেই প্রথম সাক্ষাৎ যে ভবিষ্য়তে গভীরতর হয়ে উঠবে, তার আঁচ প্রথমবারই পেয়েছিলেন মহেন্দ্রগুপ্ত। প্রথম সাক্ষাতের পর ঠাকুরের ঘর থেকে বের হওয়ার আগে, ঠাকুরের মুখে ‘আবার এসো’ কথাই যেন রামকৃষ্ণের কাছে বার বার ফিরে যাওয়ার মূলধন হয়ে উঠেছিল মাস্টারের।
রামকৃষ্ণর বাড়ি থেকে ফেরবার সময়, মাস্টারের মনে বার বার একই প্রশ্ন উঠে আসে, ”এ সৌম্য কে? যাঁহার কাছে ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা করিতেছে, বই না পড়িলে কি মানুষ মহৎ হয়? কি আশ্চর্য আবার আসিতে ইচ্ছা হইতেছে…”
এই নিয়ে বেশ কয়েকবার রামকৃষ্ণের সঙ্গে মাষ্টারমশাইয়ের সাক্ষাৎ। কী করা হয়, কোথায় বাড়ি, বাড়িতে কে কে আছেন, এই সব আলাপর্ব বহু আগেই সেরে ফেলা। বরং রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ আরও দু ধাপ এগিয়ে আধ্যাত্মিক আলোচনায় সদ্য পথ চলা শুরু। আর শুরুতেই মাস্টারকে ঠাকুরের প্রশ্ন,
শ্রীরামকৃষ্ণ—আচ্ছা, তোমার ‘সাকারে’ বিশ্বাস, না ‘নিরাকারে’?
মাস্টার (অবাক হইয়া স্বগত)—সাকারে বিশ্বাস থাকলে কি নিরাকারে বিশ্বাস হয়? ঈশ্বর নিরাকার, এ-বিশ্বাস থাকিলে ঈশ্বর সাকার এ-বিশ্বাস কি হইতে পারে? বিরুদ্ধ অবস্থা দুটাই কি সত্য হইতে পারে? সাদা জিনিস—দুধ, কি আবার কালো হতে পারে?
মাস্টার—আজ্ঞা, নিরাকার—আমার এইটি ভাল লাগে।
শ্রীরামকৃষ্ণ—তা বেশ। একটাতে বিশ্বাস থাকিলেই হল। নিরাকারে বিশ্বাস, তাতো ভালই। তবে এ-বুদ্ধি করো না যে, এইটি কেবল সত্য আর সব মিথ্যা। এইটি জেনো যে, নিরাকারও সত্য আবার সাকারও সত্য। তোমার যেটি বিশ্বাস, সেইটিই ধরে থাকবে।
মাস্টার দুইই সত্য এই কথা বারবার শুনিয়া অবাক হইয়া রহিলেন। এ-কথা তো তাঁহার পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে নাই।
তাঁহার অহঙ্কার তৃতীয়বার চূর্ণ হইতে লাগিল। কিন্তু এখনও সম্পূর্ণ হয় নাই। তাই আবার একটু তর্ক করিতে অগ্রসর হইলেন।
(মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত (যিনি “শ্রীম” ছদ্মনামে কথামৃত রচনা করেন) ছিলেন কলকাতার রিপন কলেজের অধ্যাপক। কলকাতার একাধিক স্কুলে তিনি শিক্ষকতাও করেছিলেন। তের বছর বয়স থেকে তিনি ডায়েরি লিখতেন। ১৮৮২ সালে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে তার আলাপ হয়। রামকৃষ্ণের ব্যক্তিত্বে আকর্ষিত হয়ে মহেন্দ্রনাথ তার কথোপকথন ও কার্যকলাপের স্টেনোগ্রাফিক রেকর্ড রাখতে শুরু করেন নিজের ডায়েরিতে। এই রেকর্ডটিই পরবর্তীকালে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত নামক বইয়ের আকার নেয় প্রথম দিকে মহেন্দ্রনাথ যখন ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিলেন, তখন তার সেটি প্রকাশের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। “কথামৃত-এর প্রথম খণ্ড (১৯০২) প্রকাশের আগে আ লিফ ফ্রম দ্য গসপেল অফ শ্রীরামকৃষ্ণ (১৮৯৭) নামে একটি ছোট ইংরেজি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের মৃত্যুর পর তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে মহেন্দ্রনাথ নিজের ডায়েরিটি প্রকাশের উদ্যোগ নেন। আর সেই ডায়েরিই আজকের রামকৃষ্ণকথামৃত )
সৌজন্যে- শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত