
সনাতন ধর্মে দেব-দেবীর আরাধনায় ফুল ও জলের পাশাপাশি ফল নিবেদন করা অত্যন্ত পবিত্র এবং অপরিহার্য একটি আচার। নিত্যপুজো হোক কিংবা বড় কোনও অনুষ্ঠান, দেবতাকে ভোগ নিবেদনের সময় বহু গৃহস্থই একটি সাধারণ বিষয়ে দ্বিধায় পড়েন— ঠাকুরকে ফল কি আস্ত দেওয়া উচিত, নাকি কেটে টুকরো করে দেওয়া ভালো? অনেকের মতে আস্ত ফল দেওয়া শুদ্ধ, আবার কেউ কেউ মনে করেন প্রসাদ বিতরণের সুবিধার জন্য ফল কেটেই নিবেদন করা শ্রেয়। তবে এই বিষয়ে হিন্দু শাস্ত্র এবং বাস্তুশাস্ত্রের রয়েছে কিছু সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর নিয়ম। ভুল পদ্ধতিতে ফল নিবেদন করলে পূজার পূর্ণ ফল লাভ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন ভক্তরা। চলুন জেনে নেওয়া যাক, দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে শাস্ত্র ঠিক কী নির্দেশ দেয়।
‘স্কন্দ পুরাণ’ এবং ‘পদ্ম পুরাণ’ অনুযায়ী, দেব-দেবীকে সর্বদা পূর্ণাঙ্গ বা ‘অখণ্ড’ বস্তু উৎসর্গ করাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মঙ্গলজনক। ফল কেটে ফেললে তা খণ্ডিত হয়ে যায়। তাই সম্ভব হলে পুজোর থালায় আস্ত ফল নিবেদন করাই সবচেয়ে বেশি শাস্ত্রসম্মত ও পবিত্র বলে মনে করা হয়।
ফল কাটার জন্য আমরা যে ছুরি, বঁটি বা বাসনপত্র ব্যবহার করি, তা যদি যথাযথভাবে শুদ্ধ না থাকে, তবে ফল অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া ফল কাটার সময় অসাবধানতাবশত হাতের স্পর্শ বা লালার সংস্পর্শে তা উচ্ছিষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা দেবোপাসনায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
শাস্ত্রীয় ও আয়ুর্বেদিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ফল কেটে বেশিক্ষণ খোলা রাখলে বাতাসের সংস্পর্শে এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে তার মধ্যে ‘তামসিক’ গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। ঈশ্বরকে সর্বদা ‘সাত্ত্বিক’ ও পবিত্র আহার অর্পণ করা নিয়ম, সেই কারণেই কাটা ফল অনেক সময় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সনাতন ধর্মে ‘ভাব’ বা ভক্তিই সবচেয়ে বড় কথা। পরমেশ্বরকে আমরা সবসময় আমাদের সেরা এবং সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটি দিতে আগ্রহী থাকি। ফল কেটে ফেললে তার সতেজতা ও রূপ কিছুটা নষ্ট হয়। তাই আস্ত ও সতেজ ফল নিবেদনকেই প্রকৃত ভক্তির প্রকাশ বলে মনে করা হয়।
বড় কোনও পুজো বা বিশেষ যজ্ঞের নৈবেদ্য সাজানোর সময় ফল কেটে দেওয়ার প্রথা রয়েছে। তবে শাস্ত্র অনুযায়ী, ফল কাটার পর তা বেশিক্ষণ ফেলে না রেখে অবিলম্বে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে ঠাকুরকে উৎসর্গ করা উচিত, যাতে তার পবিত্রতা বজায় থাকে।
যদি বিশেষ কারণে ফল কেটে দিতেই হয়, তবে শাস্ত্রে তার শুদ্ধকরণের বিশেষ উপায় বলা আছে। ফল কাটার পর তাতে সামান্য গঙ্গাজল ছিটিয়ে এবং প্রতিটি কাটা ফলের ওপর একটি করে তুলসী পাতা অর্পণ করা আবশ্যিক। তুলসী পাতার পবিত্র স্পর্শে যেকোনও খাদ্যের দোষ বা অশুচিতা কেটে যায় এবং তা ভগবানের গ্রহণের উপযুক্ত হয়।
সিন্নি, পঞ্চামৃত বা ফলমাখানো প্রসাদ তৈরির ক্ষেত্রে ফল কাটার নিয়ম শাস্ত্রে সম্পূর্ণ স্বীকৃত। কারণ সেখানে বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে একটি বিশেষ ‘ভোগ’ তৈরি করা হয়। তবে এই রান্নার বা প্রস্তুতির সময় সম্পূর্ণ শুচিতা ও শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করা বাধ্যতামূলক।
শাস্ত্রের এত সব কঠিন নিয়মের পাশাপাশি গীতা বা অন্যান্য পুরাণে বারবার একটি কথাই বলা হয়েছে— “পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি”। অর্থাৎ, বাহ্যিক নিয়ম যাই হোক না কেন, কোনও ভক্ত যদি অত্যন্ত পবিত্র মন ও গভীর ভালোবাসায় ফল কেটেও ভগবানকে নিবেদন করেন, ঈশ্বর ভক্তের বাহ্যিক ত্রুটি না দেখে তাঁর আন্তরিক ভক্তি ও অর্ঘ্যই সানন্দে গ্রহণ করেন।