
শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন রূপ ও নামের গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। তাঁর প্রতিটি রূপের পেছনে লুকিয়ে থাকে কোনও না কোনও দর্শন। বাঁশি বাজানো কৃষ্ণকে আমরা অনেকেই দেখেছি, কিন্তু তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় এক নাম হল ‘ত্রিভঙ্গমুরারি’ বা ‘ত্রিভঙ্গমূর্তি’। কিন্তু কখনও কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন তাঁকে এই নামে ডাকা হয়? কোন পুরাণ থেকে এই নামের উৎপত্তি এবং এর আসল অর্থই বা কী?
‘ত্রিভঙ্গমুরারি’ শব্দটিকে ভাঙলে মূলত দুটি অংশ পাওয়া যায়— ‘ত্রিভঙ্গ’ অর্থাৎ তিনটি বাঁক বা ভাজ বিশিষ্ট এবং ‘মুরারি’ অর্থ যিনি মুরের নামক অসুরকে বধ করেছিলেন (অর্থাৎ কৃষ্ণ)। শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর বাঁশি হাতে নিয়ে বাঁকা ঠাঁয় বা মুদ্রায় দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন তাঁর শরীরটি তিনটি প্রধান জায়গায়— গলা বা ঘাড়, কোমর এবং হাঁটু বা চরণ— সামান্য বাঁকানো থাকে। এই ত্রিকোণ বা ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে দাঁড়ানোর জন্যই তাঁকে ‘ত্রিভঙ্গমুরারি’ বলা হয়। শিল্পকলা এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলীতেও শ্রীকৃষ্ণের এই ভঙ্গিটিকে অত্যন্ত পবিত্র হিসেবে ধরা হয়।
পুরাণ ও কৃষ্ণ পুরাণের প্রেক্ষাপট
ভগবৎ পুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ এবং বিভিন্ন উপপুরাণ ও কৃষ্ণ পুরাণে শ্রীকৃষ্ণের রূপবর্ণনা করতে গিয়ে এই ‘ত্রিভঙ্গ’ ভঙ্গির উল্লেখ বারবার পাওয়া যায়। বিশেষ করে ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ’-এ কৃষ্ণের দিব্য রূপের বিশদ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাঁর এই ত্রিভঙ্গ মুদ্রার বিশেষ মাহাত্ম্যের কথা বলা হয়েছে। পুরাণ মতে, বৃন্দাবনের কদমতলায় যখন কৃষ্ণ বাঁশি বাজাতেন, তখন ত্রিভঙ্গ ছন্দে দাঁড়িয়েই তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে মোহিত করতেন। ঋষি ও ভক্তরা মনে করেন, সাধারণ কোনও মানুষ বা দেবতা এভাবে শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়াতে পারেন না, এটি কেবল পরম ব্রহ্মের পক্ষেই সম্ভব।
পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কৃষ্ণের এই ত্রিভঙ্গ রূপের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে গভীর জীবনদর্শন।
ঘাড়ের বাঁক: মানুষের অহংকার ও মনকে নমনীয় করার প্রতীক।
কোমরের বাঁক: জাগতিক প্রলোভন ও মোহের মাঝেও নিজের কেন্দ্রে স্থির থাকার ইঙ্গিত।
পায়ের বাঁক: কর্ম এবং ভক্তির মেলবন্ধন।
ভগবৎ পুরাণ অনুযায়ী, এই তিন বাঁক বা ভাজ আসলে মানুষের জীবনের তিনটি প্রধান স্তর— কাম, ক্রোধ ও লোভ— যা ঈশ্বরের বাঁশির সুরে বশীভূত হয়ে তাঁর দিকেই ধাবিত হয়। যখন কোনও ভক্ত এই ত্রিভঙ্গমুরারির দর্শন পান, তখন তাঁর সমস্ত মনোকামনা ও অহংকার চিরতরে বিলীন হয়ে যায়। তাই কৃষ্ণের এই রূপটি মুক্তির বার্তা।
তথ্য-Bhagavata Purana