
দুর্গাপুজোর চার দিনের আনন্দ-উৎসবের পর বিজয়া দশমী নিয়ে আসে এক পরম বিষাদের সুর। মায়ের মণ্ডপে মণ্ডপে যখন বাজে প্রতিমা নিরঞ্জনের ঘণ্টা, ঠিক তখনই বাঙালি নারীরা মেতে ওঠেন এক বিশেষ উদযাপনে—‘সিঁদুর খেলা’। লৌকিক আচার ও ভক্তি রসের মেলবন্ধনে লাল-সাদা শাড়িতে সেজে নারীরা দেবীর চরণে সিঁদুর অর্পণ করেন, তারপর একে অপরের গালে ও সিঁথিতে সিঁদুর ছুঁইয়ে দেন। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, বিজয়া দশমীর এই বিষাদময় মুহূর্তে কেন এই সিঁদুর খেলার রেওয়াজ? এর পেছনে শুধুই কি লৌকিক সামাজিক প্রথা, নাকি জড়িয়ে রয়েছে পৌরাণিক কাহিনি?
মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে, মা দুর্গা কেবল সর্বশক্তির দেবী নন, তিনি বাঙালির ঘরের মেয়েও বটে। আশ্বিন মাসে মর্ত্যে বাপের বাড়িতে চার দিনের জন্য আগমন ঘটে তাঁর। এরপর বিজয়া দশমীতে তিনি পুনরায় ফিরে যান স্বামী দেবাদিদেব মহাদেবের বাসস্থল কৈলাসে।
পৌরাণিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, বিবাহিত মেয়ে যখন বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়, তখন তাঁকে মিষ্টিমুখ করিয়ে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বরণ করে নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। মা দুর্গাকে তাই দশমীর দিন সকালে দর্পণ বিসর্জনের পর দেবীকে পানের পাতা, মিষ্টি ও সিঁদুর দিয়ে বরণ করা হয়। মায়ের সিঁথিতে ও চরণে সিঁদুর ছোঁয়ানো হয় তাঁর অখণ্ড সৌভাগ্য ও শক্তির প্রতীক হিসেবে। নারীরা বিশ্বাস করেন, দেবীকে অর্পিত এই পবিত্র সিঁদুর নিজের মাথায় বা সিঁথিতে ধারণ করলে স্বামীর আয়ু বৃদ্ধি পায় এবং সংসারের অমঙ্গল দূর হয়।
হিন্দু পুরাণে লাল রঙ ও সিঁদুরকে ‘শক্তি’ এবং সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়। মা দুর্গা নিজেই মহামায়া ও নারীশক্তির সর্বোচ্চ রূপ। সিঁদুর খেলার মাধ্যমে সধবা নারীরা দেবীর কাছ থেকে সধবা থাকার বর বা আশিস প্রার্থনা করেন। তাই অশ্রুসজল চোখে মাকে বিদায় জানানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘আসছে বছর আবার হবে’—এই বিশ্বাসের বার্তা বহন করে বিজয়া দশমীর সিঁদুর খেলা।