
কলকাতা : মহাভারতের অভিমন্যু লড়েছিলেন নিজের আপন কাকার বিরুদ্ধে। কথিত আছে, মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ (মতান্তরে ১৭)। কর্ণ, দুর্যোধন, শকুনি, গুরু দ্রোণ, দুঃশাসন – সব রথী মহারথীর বুকে একাই কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন অভিমন্যু। গতকাল তাঁর থেকে ৬ বছর বেশি বয়সের জেকব বেথেল একা লড়লেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বোলিং ইউনিটের সামনে। চক্রব্যূহতে ঢুকেও বেরোতে পারেননি অর্জুন পুত্র। ঠিক তেমনই সবাইকে নিয়ে ছেলেখেলা করলেও একমাত্র বুমরাকেই সমীহ করতে হল বেথেলকে। বুমরার সামনে করেছেন মাত্র ১৩ রান। বেথেলের ব্যক্তিগত স্কোর ? ৪৮ বলে ১০৫ ! সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচরণ করা ‘জেন-জি’ থেকে শুরু করে প্রবীণ ক্রিকেট সমর্থক, সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে নিচ্ছেন, যতক্ষণ বেথেল ক্রিজে ছিলেন, ততক্ষনই তপ্ত ফার্নেসের সামনে ট্রফি-ভাগ্য নিয়ে বাজি লড়ছিল ভারত।
২০০৩ সালে জন্ম বেথেলের। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে জন্মালেও পরিবার ছিল ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে। তাঁর ঠাকুরদা আর্থার বেথেল বার্বাডোজের হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলেছেন। বেথেলের ব্রিটিশ উত্তরাধিকার পাওয়া তাঁর বাবার সূত্রে। ইংল্যান্ডের সর্বকালীন সেরা টেস্ট ব্যাটারদের একজন জো রুট না থাকলে হয়তো কাউন্টি খেলাই হত না বেথেলের। রুট একদিন আচমকাই খুঁজে পান এই প্রতিভাকে। রুটের বাবা ও বেথেলের বাবা পুরোনো বন্ধু। সেখানেই এক অনুষ্ঠানে গিয়ে বেথেলের খেলা দেখে মনে ধরে রুটের। মাত্র ১২ বছর বয়সে রাগবি স্কুলের স্কলারশিপ পেয়ে বেথেল চলে যান ইংল্যান্ড। রাগবি থেকে শুরু করলেও ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক তাঁর বরাবর। ঘরোয়া ক্রিকেটে ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে সুযোগ পান কাউন্টি খেলার। সেখানে তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দ্রুতই তাঁকে জাতীয় নির্বাচকদের নজরে আনে। সেখান থেকে সুযোগ পান দ্য হান্ড্রেড ও টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট টুর্নামেন্টে খেলার। তারপরই মেলে দেশের জার্সি। কয়েক মাসের মধ্যেই ৩ ফরম্যাটে অভিষেক করেন জেকব। ২০২৪ সাল থেকেই তাঁর উত্থান শুরু। সাদা বলের ক্রিকেটে তিনি নিয়মিত সদস্য ‘থ্রি লায়ন্স’দের। ২০২৫ আইপিএলে বিরাট কোহলির দল আরসিবির হয়ে খেলেছিলেন বেথেল। ২ ম্যাচ খেললেও একটি ম্যাচে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছিল ঝকঝকে হাফসেঞ্চুরি। আগামী আইপিএলেও আরসিবির হয়েই খেলতে দেখা যাবে তাঁকে।
২৫৪ রান তাড়া করতে গিয়ে একসময় চূড়ান্ত চাপে ছিল ইংল্যান্ড। ৬ ওভারের মধ্যেই ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল ইংল্যান্ড। সেখান থেকেই উইল জ্যাক্সের সঙ্গে পাল্টা প্রতিরোধ শুরু করলেন বেথেল। ২২ বছরের তরুণ তখন একপ্রকার পাড়ার বোলারের পর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছেন বরুণ, অর্শদীপদের। গতকাল বেথেলের সামনে বারবার অসহায় লেগেছে ভারতীয় বোলারদের। বুমরা ব্যতিক্রম হলেও কাল যেভাবে বরুণের ‘মিস্ট্রি’ ফাঁস করে দিয়েছেন বেথেল, তাতে ফাইনালে তাঁর বদলে কুলদীপকে মাঠে দেখলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এটাও মনে রাখতে হবে, কোনও ভারতীয় বোলার তাঁকে আউট করতে পারেননি। বেথেল সাজঘরে ফিরেছেন রান আউট হয়ে। তবে ২৫৪ রানের পাহাড় তাড়া করতে নেমে যেভাবে একার হাতে ইংল্যান্ডকে প্রায় জয়ের সরণিতে পৌঁছে দিয়েছিলেন বেথেল, তাতে ধরে নেওয়াই যায় বেথেল হতে পারেন ভবিষ্যতে ‘বাজবল’ ক্রিকেটের বড় মুখ। কিন্তু ওই যে, অভিমন্যুরা লড়াই জেতেন না, এই আপ্তবাক্য তো ভারতের প্রাচীন মহাকাব্যেই লেখা আছে!