
কলকাতা : বেশি নয়, মাত্র এক মাস আগের ঘটনা। ফাইনালে ‘অপ্রতিরোধ্য’ আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে যে মুহূর্তে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিলেন ইয়ামাল, রদ্রিরা, সেই মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন লিওনেল মেসি। হল না, এবারেও হল না। টানা দুই বার দেশকে বিশ্বকাপ দেওয়ার বিরল কৃতিত্বে ভাগ বসানো হল না। কী কী না করেননি মেসি? দুর্দান্ত কিছু গোল করেছেন, দলকে এই বিশ্বকাপে বারবার খাদ থেকে টেনে তুলেছেন, হারা ম্যাচ জিতিয়েছেন – আর কী করবেন একজন ৩৯ বছরের ‘তরুণ’? সেই কান্না দেখে চোখ ভিজেছিল ছোট থেকে বড় – সবার। আজকের, ৩১ আগস্টের পর সবই অতীত।
মেসি অবসর নিয়েছেন – এই খবরে ঠিক এখনও যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না সোশ্যাল মিডিয়া জেনারেশন। অনেকেই বলছেন, কেন সেদিন অবসর জানালেন না, মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মধ্যে, গোটা বিশ্বের সামনে? কেন প্রহেলিকা রাখলেন? কিন্তু তিনি তো লিওনেল মেসি। তিনি আর পাঁচজন স্বাভাবিক ফুটবলারের মতো কেন বেসিক এবিসিডি ফলো করবেন? কেন অন্য কারও মতো ঘুনাক্ষরেও টের পেতে দেবেন? তাঁর ফুটবল থেকে শুরু করে অবসর – সবই তো হবে নিজের মতো করে। তাই সোশ্যাল মিডিয়াতে ডায়েরির ৩টি পাতার ছবি দিয়ে একটা ছোট্ট মেসেজ। তার কিছুক্ষন পর একটা ছোট ভিডিও। যার দৈর্ঘ্য ? ২ মিনিট। নিজের ছোটবেলা থেকে শুরু করে বিশ্বজয় – সব রয়েছে সেই ভিডিওতে। ছোট্ট লিও, যে বল পায়ে আপনভোলা ছন্দে বল নাচাচ্ছে, সেও যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে এমন এক মেসি, যে ম্যাচ হেরে হাউহাউ করে কাঁদছে। যার কাছে জয়, জীবন, ট্রফি – সব তখন তুচ্ছ। বছর ছয়েক আগে এমন এক ভিডিওর মাধ্যমে এই আগস্টেই ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। আজ মেসির ভিডিওতেও পাওয়া গেল সেই নিজেকে খোঁজার স্বাদ।
প্রতিবেদনের লেখক বা পাঠক, যদি এমন কোনও ভিডিও বানিয়ে অবসর ঘোষণা করতে চাইতাম, তাহলে সেখানে যা যা থাকবে, সবই সফলতায় মোড়া। সেখানে থাকবে না কোনও ২০১৬ কোপা আমেরিকা ফাইনালের কান্না, থাকবে না কোনও অশ্রুসিক্ত একজোড়া চোখ, থাকবে না কোনও ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল পরবর্তী ভিডিও। কিন্তু, তিনি, মেসি রেখেছেন। রেখেছেন নিজের সেই গ্লানিগুলোকে, সেই ব্যর্থতাগুলোকে। এমন কিছু ব্যথা রয়ে গিয়েছে তাঁর ২১ বছরের কেরিয়ারে – যা বারবার রক্তাক্ত করেছে মেসির মননকে। ভিডিওতে রয়েছেন সমর্থকরা, যাঁরা মেসির যাবতীয় ব্যর্থতায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সহমর্মিতার। যাঁরা ব্যর্থ মেসিকে বলার চেষ্টা করেছেন, “আমরা আছি তো।” এই অসময়ে “আমরা আছি তো” বলার মতো কেউ নেই, যাঁরা সাফল্যে বুকে জড়িয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ব্যর্থতাতে পাশে দাঁড়াবেন।
ভিডিওতে রয়েছেন আরও এক কিংবদন্তি, দিয়েগো মারাদোনাও – যিনি ২০১০ বিশ্বকাপে শুধুই মেসির কোচ ছিলেন না, ছিলেন এমন এক মর্মরমূর্তি, যাকে বারবার ছাপিয়ে যেতে চেয়েছিলেন মেসি। যে মারাদোনা ১৯৮৬ বিশ্বকাপে স্রেফ পায়ের জাদুতে গোটা বিশ্বকে সম্মোহিত করে দিয়েছিলেন, সেই মারাদোনাকে পিছনে ফেলে বারংবার এগোতে চেয়েছেন মেসি। মারাদোনা বনাম মেসি – এই বিতর্ক চলবে আজীবন কিন্তু লিও যেভাবে মারাদোনা পরবর্তী যুগে গোটা আর্জেন্টিনাকে নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার কোনও জবাব নেই।
অনেকেই এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালের পর বলেছিলেন, চার বছর আগে ছেড়ে দেওয়াটাই হত আদর্শের অবসর। শেষবার জার্সি খুলে রেখে দিলাম, সঙ্গে রাখলাম বিশ্বকাপটাও। নে কত ট্রোল করার, করে নে। কিন্তু মেসি এমন এক গতানুগতিক সোমবারের সন্ধ্যেকে বেছে নিলেন, যেদিনের কথা কেউ ভাবেনি। একটি বিদেশী প্রভাব আছে, যদি কোনও আতরের শিশি ভেঙে যায়, তা শেষবারের জন্য গন্ধ ছড়িয়ে যায়। আজকের পর মেসি যেন আর্জেন্টিনা দলে সেই আতর – যার অদৃশ্য উপস্থিতি থাকবে আজীবন, খালি সশরীরেই হয়তো দলের অসময়ে মাঠের মধ্যে পাওয়া যাবে না তাঁকে। চ্যাম্পিয়নরা তো এমনই হন। যাঁরা আসেন, মাইকেলের ভাষায় ‘ক্ষণকাল তিষ্ঠে’ আবার চলে যান অন্য কোনও গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। পড়ে থাকে? শুধু একরাশ উপস্থিতির গন্ধ…যেন কোনও ভেঙে যাওয়া আতরের শিশি।