
বাঁকুড়া: সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক পোড়ো কাঁচা মাটির বাড়ি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশ কিছু বাড়ি প্রায় মিশে গিয়েছে মাটিতে। ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়া বাকি বাড়িগুলিও ভগ্নপ্রায়। সন্ধ্যা নামলেই সেই বাড়িগুলিতে অবাধে আনাগোনা করে বিষধর সাপ, শিয়াল, পেঁচার দল। নিঝুম রাতে দূর থেকে ভেসে আসে শিশুর কান্নার মতো বিভিন্ন শব্দ! সন্ধ্যা নামলেই বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের চালিবাড়ির ডিহি গ্রাম যেন হয়ে ওঠে আস্ত একটা ভূতুড়ে গ্রাম।
বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের অন্যতম সমৃদ্ধ গ্রাম বড়জুড়ি। এই গ্রামের বাউরি পাড়ায় ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় ২০ -২২ টি পরিবার উঠে গিয়েছিল গ্রাম থেকে বেশ কিছুটা দূরে থাকা সরকারি খাস জমিতে। একের পর এক কাঁচা মাটির বাড়ি তৈরি করে গড়ে তুলেছিলেন চালিবাড়ির ডিহি নামের আস্ত একটি গ্রাম। মানুষের আনাগোনা, কোলাহল আর দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছিল নতুন এই গ্রাম। কিন্তু বছর ১৩ আগে আকস্মিক ঘটে যাওয়ায় বদলে যায় গ্রামের ভাগ্য।
গ্রামেরই এক গৃহবধূ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের জেরে এক যুবকের সঙ্গে অন্যত্র পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বাধা দেয় মহিলার সন্তান। শেষ পর্যন্ত নিজের সন্তানের গলা কেটে খুন করে অন্যত্র পালিয়ে যান ওই গৃহবধূ। পরে পুলিশের হাতে ধরাও পড়েন তিনি। ২০১৩ সালে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার পর থেকেই গ্রামের মানুষের মনে চেপে বসে এক অদ্ভুত আতঙ্ক। যেন অশরীরী কথা বলে!
গ্রামবাসীরা নাকি সন্ধ্যা নামলেও বিভিন্ন ধরনের অতিপ্রাকৃতিক শব্দ শুনতে পেতেন। গ্রামবাসীদের দাবি, তাঁদের কানে ভেসে আসত কান্নার শব্দ! আতঙ্ক চেপে বসে এতটাই যে ধীরে ধীরে বাড়ি ঘর ছেড়ে ফের বড়জুড়ি গ্রামে ফিরতে শুরু করে পরিবারগুলি। একে একে প্রায় ফাঁকা হয়ে যায় গোটা গ্রাম।
ধীর ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে বাড়িগুলি। ধীরে ধীরে ধসে পড়ে বাড়িগুলির দেওয়াল। বাড়ির উঠোন ঢাকা পড়ে যায় ঘন ঝোপঝাড়ে। অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ না থাকায় শুধুমাত্র ২টি পরিবার আতঙ্ককে সঙ্গী করেই থেকে যায় গ্রামে। কিন্তু তাঁদের আতঙ্ক এতটাই যে সন্ধ্যার অন্ধকার নামলে আজও তারা দরজায় খিল এঁটে গৃহবন্দি হয়ে থাকেন।
সন্ধ্যার পর আর চালিবাড়ির ডিহি গ্রামের পথ মাড়াননা স্থানীয় বাসিন্দারা। গত দেড় দশকে ভূতের আতঙ্ক দূর করে গ্রামবাসীদের ফের গ্রামে ফেরানোর কম চেষ্টা করেনি স্থানীয় ব্লক প্রশাসন ও বিজ্ঞান কর্মীরা। বিভিন্ন বিষয়ের কার্য-কারণ বিশ্লেষণ করে গ্রামবাসীদের বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আতঙ্ককে জয় করে গ্রামবাসীরা আর ফিরতে পারেননি চালিবাড়ির ডিহি গ্রামে। ফলে আজও লোকমুখে ভূতুড়ে গ্রাম হিসেবেই পরিচিত হয়ে আছে ওই গ্রাম। বিজ্ঞান মঞ্চের দাবি এই সবকিছুর পিছনেই রয়েছে গ্রামবাসীদের মনে গেঁথে থাকা অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার। আগামিদিনে ফের তাঁদের এই কুসংস্কার দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।