
ঝাড়গ্রাম: লড়াইটা সহজ নয়। প্রথমেই টের পেয়েছিলেন। পুরুষ থেকে নারী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় ঘর ছাড়তে হয় তাঁকে। অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে বাড়ি বাড়ি টিউশন পড়ানো, অঙ্কন শেখানো, নৃত্য শেখানোর মধ্য দিয়ে স্বনির্ভরতার পথ খুঁজেছেন। চালিয়ে গিয়েছে নিজের পড়াশোনা। পুরুষের পোশাক ছেড়ে নারীর পোশাক পরনে নিয়ে বসেন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়। শত বাধা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ উপেক্ষা করেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। আগামী দিনে দৃশ্যকলা নিয়ে সমাজের বুকে রূপান্তরকামী নারী রূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে তাঁর দু’চোখে। তিনি হলেন ঝাড়গ্রাম শহরের বামদা এলাকার ১৯ বছর বয়সের অনুভব পাল। অবশ্য এখন তিনি আলিয়া।
আলিয়া হয়ে উঠার যাত্রাপথ শুরু হয়েছিল যখন অনুভবের বয়স মাত্র ১০ বছর। তখনই অনুভব অনুভব করেছিলেন, তাঁর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে নারীত্ব গুণ। মেয়েদের মতো সাজগোজ করাতে ভালো লাগত তাঁর। ছোট্ট বয়সেই নিজের ইচ্ছা ভয়ের চোটে পরিবারের কারও কাছে প্রকাশ করতে পারেননি তখন। ২০১৯ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই মা পাপিয়া পালের মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়েন। নিজের মনের ইচ্ছাকে বুকে চাপা রেখেই বাবাকে অবলম্বন পরে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ২০২১ সালে বাবা মিঠুন পাল দ্বিতীয় বিয়ে করলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
২০২৪ সালে ঝাড়গ্রাম বাণীতীর্থ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার পর বুকে সাহস জুগিয়ে পরিবারের কাছে লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুরুষ থেকে নারী হওয়ার কথা জানান। তারপরই তাঁর জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। বাবার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় শহরের বাছুরডোবা এলাকায় তাঁর মাসির বাড়িতে আশ্রয় নেন। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে এবং তাঁর ইচ্ছা পূরণে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায় অর্থ সংকট। বাড়ি বাড়ি টিউশন পড়ানো, অঙ্কন শেখানো, নৃত্য শেখানো শুরু করেন। এমনকি অর্থ উপার্জনের জন্য মেয়েদের মেহন্দি পোরানোর কাজও করেন।
মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েই সাইকোলজির চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর ইচ্ছে পূরণের দিকে এগোতে শুরু করেন। একাদশ শ্রেণিতে ঝাড়গ্রাম ননীবালা বিদ্যালয়ে লিঙ্গ নির্বাচনের জায়গায় পুরুষ, মহিলার পরিবর্তে অন্যান্য লিঙ্গ নির্বাচন করে ভর্তি হন। পাশে দাঁড়ায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। ছাত্রের পোশাক ছেড়ে ছাত্রীর পোশাক গায়ে নিয়ে স্কুলে ক্লাস শুরু করেন। সহপাঠী নতুন বান্ধবীও গড়ে ওঠে অনুভবের। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আর পাঁচটা ছাত্রীর সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনও করতেন। নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় তাঁকে।
এবারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৩৩৫ নম্বর নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন আলিয়া। তাঁর সর্বোচ্চ নম্বর রয়েছে বাংলা এবং ভূগোলে। ভবিষ্যতে দৃশ্যকলা নিয়ে বিশ্বভারতী কিংবা রবীন্দ্রভারতীতে পড়াশোনার ইচ্ছে রয়েছে। সেখানে সুযোগ না পেলে বাংলা বা ভূগোলে স্নাতক পড়ার কথা জানিয়েছেন অনুভব। তবে অনুভবের এই যাত্রা পথে পরিবারের সাহায্য না থাকায় তাঁর সমস্যার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সমস্যা।
কী বলছেন অনুভব ওরফে আলিয়া?
ছোট্ট বাড়ির বারান্দায় বসে অনুভব বলেন, “হরমোন চিকিৎসা চলছে। তা শেষ হলেই অস্ত্রোপচার হবে আমার। গৃহশিক্ষকতা করেই নিজের পড়াশোনা এবং চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। আগামিদিনে প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে অস্ত্রোপচার করাব।” বর্তমানে বামদায় ঠাকুমা গঙ্গা পালের সঙ্গে নিজেদের বাড়িতেই থাকেন আলিয়া। তাঁর বাবা দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর সঙ্গে অন্যত্র বাড়ি তৈরি করে রয়েছেন। গঙ্গা বলেন, “প্রথমে নাতির এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারিনি। পরে যখন বুঝলাম ভালো রয়েছে, তখন মেনে নিয়েছি। আমি চাই সে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক।”
ঝাড়গ্রাম ননীবালা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুক্তিপদ বিশুই বলেন, “ভর্তির সময় অনুভব পুরো বিষয়টি আমাদের জানিয়েছিল। আমরা সব সময় তাঁর উপরে বিশেষ নজর রাখতাম। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো নম্বর নিয়ে পাস করেছে। আমরাও চাই আগামী দিনের সে তাঁর স্বপ্নে সফল হোক।”