
তন্ময় নন্দী
ঝাড়গ্রাম: এ যেন ‘নেই’-র গ্রাম। নেই গ্রামে পৌঁছানোর রাস্তা। নেই পানীয় জল। স্বাধীনোত্তর ভারতে আধুনিকতার ছোঁয়া যখন সর্বত্র, ঠিক তখনই এক অন্য অন্ধকারের ছবি ধরা পড়ল ঝাড়গ্রামের বিনপুর বিধানসভার বাঁশপাহাড়ি অঞ্চলে। এই অঞ্চলের খেড়িয়ারাতার দেশমূল গ্রামের কাশীঘুটু পাড়ায় এখনও পৌঁছায়নি উন্নয়নের আলো। গোটা গ্রামে ঢোকার কোনও পাকা রাস্তা নেই। মেঠো আল পথ পেরিয়ে গ্রামে যেতে হয়। নেই বিশুদ্ধ পানীয় জলের ন্যূনতম ব্যবস্থা। আজও কুয়োর নোংরা জলই এই গ্রামের প্রায় গোটা দশেক পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ। আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্রামটিতে ভোটের সময় একবারই নেতাদের পা পড়ে। ভোট মিটে গেলেই তাঁদের আর কোনও খোঁজ রাখেন না কেউই। উধাও হয়ে যায় প্রতিশ্রুতির বন্যা।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও এই পরিবারগুলির কপালে জোটেনি মাথা গোঁজার মতো একটা পাকা সরকারি ঘর। লালমাটি আর টালির চাল দেওয়া ভাঙাচোরা কাঁচা বাড়িতেই চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। ঝড়-বৃষ্টির দিনে চালের জল আটকাতে কালঘাম ছোটে বাসিন্দাদের।
কী বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা?
জঙ্গলে ঘেরা গ্রামে দাঁড়িয়ে লালমোহন মুর্মু বলছিলেন, “আমাদের রাস্তার অবস্থা বেহাল। ২ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়। এখনও আমরা মাটির ঘরে বসবাস করি। কুয়োর জল খাই। গ্রীষ্মে কুয়োর জল পাওয়া যায় না। তখন পুকুর, ডোবার জল খেতে হয়।” কলেজের তৃতীয় বর্ষের পড়ুয়া সনৎ হাঁসদা বলেন, “আমার কলেজ বাড়ি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে। প্রথম ২ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়। বাইকও যেতে পারে না। আমাদের খুবই কষ্ট হয়।”
কেউ কেউ ওই এলাকা ছেড়ে কিছুটা দূরে উঠে এসেছেন। তাঁদেরই একজন রবীন্দ্র হাঁসদা বলেন, “কেউ অসুস্থ হলেও গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না। দোলায় করে আনতে হয়। খাওয়ার জল পাওয়া যায় না। সেজন্য আমরা চলে এসেছি।”
রাজনীতিতে পালাবদল ঘটেছে বারবার। কিন্তু এই প্রান্তিক মানুষগুলোর ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনকালের পর এবার বিকল্প হিসেবে পদ্ম শিবিরের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে এই পরিবারগুলি। কেন্দ্রে বা রাজ্যে বিজেপির পক্ষ থেকে কি তাঁদের এই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা হবে? আসবে কি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন? এই প্রশ্ন বুকে নিয়েই এবারও ভোটের লাইনে দাঁড়ায়ে ভোট দিয়েছে এই অবহেলিত মানুষগুলো। ভোটের পর জঙ্গলমহলের এই প্রত্যন্ত গ্রামে সত্যিই উন্নয়নের আলো পৌঁছবে কি না, সেটাই এখন দেখার।