
কলকাতা: আজ থেকে শুরু হয়েছে ট্রাইব্যুনাল। জোকায় পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় ইনস্টিটিউটে বসেছে এসআইআরের ট্রাইব্যুনাল। সকাল থেকেই কাজ শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে কিছু অংশে কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে বলে খবর। তবে, শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পরও কেন দেরি হল ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু করতে? বিচারাধীন ভোটাররা কি ভোট দিতে পারবেন? এরকম একাধিক প্রশ্ন উঠে আসছে। ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত সব প্রশ্নের উত্তর রইল এই প্রতিবেদনে।
1.কবে ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট?
১০ মার্চ। বিচারাধীন ভোটারদের সমস্যা মেটাতে ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল রাজ্য সরকার। রাজ্যের তরফে মামলা লড়ছিলেন আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। সেইসময় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আবেদন ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু, জুডিশিয়াল অফিসারদের নেওয়া সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কোথায় আবেদন করা যাবে,সেই প্রশ্নও উঠে। তারপরই ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
2.ট্রাইব্যুনাল নিয়ে ঠিক কী বলেছিল সুপ্রিম কোর্ট? কবে গঠিত হয় ট্রাইব্যুনাল?
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির পরামর্শে ট্রাইব্যুনাল তৈরি হবে। এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয় কলকাতা হাইকোর্টকে। তাতে একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি থাকবেন বলেও উল্লেখ করা হয়, ২ জনকে সিনিয়র জজকে থাকার কথাও বলা হয়েছিল। জুডিশিয়াল অফিসারদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে যারা আবেদন জানাবে, ওই ট্রাইব্যুনাল তাদের আবেদন খতিয়ে দেখবে। সুপ্রিম কোর্ট গত ১০ মার্চ এই নির্দেশ দেয়। ট্রাইব্যুনাল গঠন হয় ২০ মার্চ। কমিশন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কলকাতা হাইকোর্টের ১৯ জন অবসারপ্রাপ্ত বিচারপতি ও বিচারকদের নিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়।
3. ট্রাইব্যুনালে কাদের বিচার?
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, মোট ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম বিবেচনাধীন তালিকায় রয়েছে। তাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেওয়া হয় শতাধিক জুডিশিয়াল অফিসারদের। এই ৬০ লক্ষের মধ্যে যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদন করতে পারবেন। যদি নিজেকে বৈধ ভোটার হিসেবে তাঁরা প্রমাণ করতে চান, অর্থাৎ বৈধতা প্রমাণে উপযুক্ত নথি থাকলে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা যাবে। পুনরায় ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য আবেদনের সুযোগও থাকছে ট্রাইব্যুনালে।
4.কটা ট্রাইব্যুনালে গঠিত হয়?
১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। কলকাতার জোকায় পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় ইনস্টিটিউটে ট্রাইব্যুনাল বসছে। ২ এপ্রিল থেকেই ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, নির্দিষ্ট সময়ে সেই কাজ শুরু করা যায়নি।
5.ট্রাইব্যুনালে কাজ শুরুতে দেরি কেন, কী কী সমস্যা?
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ট্রাইব্যুনাল গঠনে দেরি হয়। ট্রাইব্যুনাল গঠনে একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। জানা গিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ দিলেও তাতে বলা ছিল না যে কীভাবে ট্রাইব্যুনালে কাজ হবে। কোন পদ্ধতিতে আবেদনের নিষ্পত্তি করা হবে, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। পরে অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টকে নির্দেশ দেয় তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করতে। তারপরই তিন প্রাক্তন বিচারপতির কমিটি গড়েন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল। ট্রাইব্যুনালে ১৯ জন প্রাক্তন বিচারক-বিচারপতি কোন পদ্ধতি মেনে কাজ করবেন, সেটাই নির্ধারণ করেছে কমিটি।
কোথায় ট্রাইব্যুনালের কাজ হবে, তা নিয়েও সংশয় ছিল। প্রথমে জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চে ট্রাইব্যুনালের আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু, তাতেও সমস্যা তৈরি হয়। এরপর ট্রাইব্যুনালের জন্য জোকার ইনস্টিটিউশন পাওয়া গেলেও সেখানে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব ছিল। তিন দিন আগেই জানানো হয় জোকার অফিসে পরিকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। গতকালই জোকার ট্রাইব্যুনালের অফিস পরিদর্শনেও যান দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাক্তন বিচারক-বিচারপতিরা। তারপরই সোমবার থেকে ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু হবে বলে জানানো হয়। সেইমতো আজ সকাল থেকে ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল গঠনে দেরির আরও একটা কারণ হল বিচারকদের পারিশ্রমিক নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। পরে সেই সমস্যাও মেটে।
6.ট্রাইব্যুনালে কত লক্ষ মানুষের বিচার হবে?
ট্রাইব্যুনালে কতজনের বিচার হবে? বিবেচনাধীন ৬০ লক্ষের মধ্যে যে ২৭ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করবেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, বাদ যাওয়া প্রত্যেক ভোটারই ট্রাইব্যুনালে আবেদনের সুযোগ পাবেন। আজ সুপ্রিম কোর্টের এসআইআর মামলায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ১৬ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি জানিয়েছেন, ৩৪ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে।
7. ট্রাইব্যুনালে আবেদনের প্রক্রিয়া কী কী?
অনলাইন ও অফলাইনে আবেদন করা যাচ্ছে। অনলাইনে আবেদনের পদ্ধতি হল
কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন করতে হবে
https://voters.eci.gov.in/-এ গিয়ে আবেদন করতে হবে
ওয়েবসাইটে পশ্চিমবঙ্গের জন্য় নির্দিষ্ট অপশন থাকবে
প্রথমে মোবাইল নম্বর দিয়ে লগ ইন করতে হবে
সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বরে ওটিপি আসবে
ওটিপি দেওয়ার পর লগ ইন করা যাবে
এপিক নম্বর দিয়ে সার্চ করলেই ভোটারের নাম দেখা যাবে
আবেদনপত্রে চারটি শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে
প্রথমে আবেদনকারীর পিন কোড-সহ পুরো ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে
খেয়াল রাখতে হবে ২৫০ শব্দের যেন বেশি না হয়।
কেন আবেদন করতে হবে? এক হাজার শব্দের মধ্যে তা লিখতে হবে
আপিলে কী চাওয়া হচ্ছে, তা ৫০০ শব্দের মধ্যে লিখতে হবে
আবেদনকারীকে জানাতে হবে কোন জায়গার ভোটার ছিলেন
সব তথ্য পূরণের পর সাবমিট করলেই ট্রাইব্যুনালের আবেদন সম্পূর্ণ হবে
অফলাইনে পদ্ধতির আবেদন হল
অফলাইনে জেলাশাসকের অফিসে গিয়ে ফর্ম ফিলাম করে আবেদন জানাতে পারেন। এছাড়া, অতিরিক্ত জেলাশাসক এবং মহকুমাশাসকের কাছে অফলাইনে আবেদন করা যাবে। আবার জোকার অফিসে গিয়েও আজ থেকে আবেদন করতে পারবেন।
8. সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী কতজন ট্রাইব্যুনালে বিচার পেলেন?
ট্রাইবুনালের কাজ শুরুর পর এখনও পর্যন্ত কতজন বিচার পেলেন, তা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট করা হয়নি কমিশনের তরফে। তবে, ইতিমধ্যেই দু’জন কংগ্রেস প্রার্থীর আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। জানা গিয়েছে, শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী তিনজনের নাম নিষ্পত্তি হয়েছে।
9. ভোটার তালিকা ফ্রিজ করার পর যাঁরা গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছেন, তাঁরা কি ভোট দিতে পারবেন?
ভোটার তালিকা ফ্রিজ হওয়ার পর যাঁদের নাম উঠেছে, তাঁরা আপাতত কেউ ভোট দিতে পারবেন কি না তা স্পষ্ট নয়। সেরকমই ইঙ্গিত মিলেছে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে। আজ এসআইআর মামলার শুনানি ছিল সুপ্রিম কোর্টে। সেখানেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আবেদন করেন, ২৩ এপ্রিল ভোটের আগে যত সম্ভব কেসের শুনানি শেষ করা হোক। ভোটাধিকার প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমরা ট্রাইব্যুনালের উপর চাপ দিতে পারি না।” পরে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, আমাদের একটু ভাবার সময় দিন। দু’পক্ষের কথাই আমাদের মাথায় রাখতে হবে।
10. ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীনদের ভবিষ্যত কী হবে? ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন?
আজ সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদন, “১৬ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। তাঁদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। প্রধান বিচারপতি বলেন, “কোনও প্রশ্নই ওঠে না।”
11. যাঁরা ট্রাইব্যুনালে গ্রিন সিগন্যাল পাবেন না, তাঁদের কী হবে?
ট্রাইব্যুনালে যাঁরা গ্রিন সিগন্যাল পাবেন না, ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ হয়ে যাবে। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেই বিষয়ে কিছুই জানায়নি কমিশন।