Falta History: নবাব সিরাজের সময়ে ফলতায় শরণার্থী ব্রিটিশরা, কোন ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে এর মাটিতে?

forgotten history dutch fort and falta: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের উত্তপ্ত আবহেও ফলতা কেল্লার এই মাটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই কেল্লার প্রবেশদ্বারেই থাকা স্থানীয় শাসকদলের কার্যালয়কে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যেকার তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত এবং ক্ষমতার লড়াই আজ ফলতাকে প্রতিনিয়ত খবরের শিরোনামে রাখছে।

Falta History: নবাব সিরাজের সময়ে ফলতায় শরণার্থী ব্রিটিশরা, কোন ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে এর মাটিতে?

|

May 19, 2026 | 2:48 PM

শুধু আজ নয়, বাংলার ইতিহাসের পাতাতেও বরাবরই অগ্নিগর্ভ ছিল ফলতা অঞ্চল। ২০২৬ সালের মে মাস হোক কিংবা ১৭৫৬ সালের জুন মাস ফলতা এখনও যেমন খবরের শিরোনামে উঠে আসে বার বার, বাংলার ইতিহাসের ফলতার অধ্য়ায় ইতিহাসবিদদের আগ্রহকে বার বার বাড়িয়ে দিয়েছিল। কী এমন ঘটনা লুকিয়ে রয়েছে ফলতার মাটিতে?

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের উত্তপ্ত আবহেও ফলতা কেল্লার এই মাটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই কেল্লার প্রবেশদ্বারেই থাকা স্থানীয় শাসকদলের কার্যালয়কে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যেকার তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত এবং ক্ষমতার লড়াই আজ ফলতাকে প্রতিনিয়ত খবরের শিরোনামে রাখছে। অথচ, এই রাজনৈতিক কোলাহলের আড়ালেই চাপা পড়ে রয়েছে এক সুপ্রাচীন ইতিহাস। ১৭৫৬ সালে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা যখন কলকাতা থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করলেন, তখন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তা ব্যক্তিরা নারী ও শিশুদের নিয়ে আশ্রয় খুঁজেছিলেন ভাগীরথী নদীর ভাটিতে, এই ফলতাতেই। সে সময়কার চঁচুড়ার ওলন্দাজ গভর্নর আদ্রিয়ান বিসডম ক্রুদ্ধ নবাবের কোপ থেকে বাঁচতে ইংরেজদের নিজেদের দুর্গের ভেতরে আশ্রয় দিতে না পারলেও, তাঁদের পাশে জাহাজ নোঙর করার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং গোপনে সব ধরনের রসদ জুগিয়েছিলেন।

১৭৫৬ সালের ২৬শে জুন ইংরেজরা এসে পৌঁছায় এই ফলতায় (পুরোনো নথিতে যা ‘ফুলতা’ নামে পরিচিত)। বছরের শেষমাস পর্যন্ত তাঁরা এখানেই টিকে ছিলেন একপ্রকার খড়কুটো আঁকড়ে ধরে। অবশেষে মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) থেকে রবার্ট ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের নেতৃত্বে বিশাল এক রণতরী ও ব্রিটিশ সেনা এসে পৌঁছলে ইংরেজদের ভাগ্য ফেরে। সেখান থেকেই ২৬শে ডিসেম্বর, ১৭৫৬ সালে তাঁরা কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেয় এবং ১৭৫৭ সালের ২রা জানুয়ারি পুনর্দখল করে কলকাতা। যার চূড়ান্ত পরিণতি আমরা দেখি পলাশীর আম বাগানে।

পরবর্তীকালে, ১৮২৫ সালের এক ঐতিহাসিক চুক্তি অনুযায়ী ওলন্দাজ ও ব্রিটিশদের মধ্যে ঔপনিবেশিক অঞ্চল বিনিময় হয়। সুমাত্রার বিনিময়ে ফলতা দুর্গের কর্তৃত্ব চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে। দেশভাগ ও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ভারতের নতুন সরকার এই ঐতিহাসিক দুর্গটিকে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহার করে। আজ দুর্গের অভ্যন্তরে ঢুকলে মনে হবে এটি পশ্চিমবঙ্গের আর পাঁচটা সাধারণ বর্ধিষ্ণু গ্রামের মতোই, যেখানে উদ্বাস্ত পরিবারগুলির বংশধরেরা বসবাস করছেন। তবে এখানকার কিছু প্রাচীন স্থাপত্য ও ধ্বংসাবশেষ আজও অতীত গৌরবের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

স্থানীয় মানুষের কাছে এই অঞ্চলটি আজও ‘ফলতা কেল্লা’ নামে পরিচিত। ফলতা থানা থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার এগোলেই দেখা মিলবে এই কেল্লার প্রবেশপথের। কেল্লার ঠিক বাইরেই রয়েছে একটি দীর্ঘ জলাশয়, যা আসলে দুর্গের চারপাশের প্রাচীন পরিখা। পরিখাটি এতটাই চওড়া ও গভীর যে আধুনিক যুগের যেকোনও বড় গাড়িকেও অনায়াসে ডুবিয়ে দিতে পারে। এই পরিখার ওপর গড়ে ওঠা আধুনিক কংক্রিটের সেতুটি সম্ভবত পুরোনো আমলের সেই ‘ড্র-ব্রিজ’ বা ঝুলন্ত সেতুরই এক আধুনিক রূপান্তর। তবে আজ এই জায়গা প্রায় ধ্বংসস্তূপের রূপ নিয়েছে।

সেতু পার হতেই চোখে পড়ে দুই তলা বিশিষ্ট দুর্গের প্রধান ফটক বা তোরণ। খিলানযুক্ত এই প্রবেশদ্বারটি যে বহু প্রাচীন, তা এক পলকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গেট কমপ্লেক্সে অনেক নতুন নির্মাণ হয়েছে এবং বর্তমানে এটি একটি পরিবারের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ফটক পেরিয়ে মাত্র ৪০ মিটার পশ্চিমে গেলেই চোখে পড়ে একটি প্রাচীন বাতিঘর, যা আজও একটি ছোট ঢিবির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে অতীতের সেই উত্তাল দিনগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে শুধু এই কেল্লাই নয়, রয়েছে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর বাড়িও।

Follow Us